ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’ শুধু একটি চিত্রকর্ম নয় বরং এটি বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বের প্রতিচ্ছবি। তার আঁকা এই বিখ্যাত ছবিটি তরল গতিবিদ্যার বিশৃঙ্খল প্রবাহ তত্ত্ব বা টার্বুলেন্স থিওরির সঙ্গে আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে তার তুলির আঁচড়ে আঁকা সর্পিল আকাশ ও ঘূর্ণায়মান মেঘগুলো প্রকৃত টার্বুলেন্সের একটি চিত্র তুলে ধরে। ১৮৮৯ সালে, দক্ষিণ ফ্রান্সের সেন্ট-রেমি-দ্য-প্রোভঁস শহরের একটি মানসিক হাসপাতালের জানালা দিয়ে আকাশের দৃশ্য দেখেছিলেন ভ্যান গঘ। সেই দৃশ্য অনুপ্রাণিত করেছিল তাকে ‘দ্য স্টারি নাইট’ আঁকতে। এটি শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, এতে লুকিয়ে আছে গভীর বিজ্ঞান।গবেষকদের মতে, ভ্যান গঘ সম্ভবত স্বাভাবিক প্রবাহের জটিলতা বোঝার একটি বিশেষ ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন, যদিও তিনি বিজ্ঞানের এই বিশেষ শাখা সম্পর্কে জানতেন না।
সোভিয়েত গণিতবিদ আন্দ্রে কলমগোরোভ ১৯৪০-এর দশকে তরল প্রবাহের শক্তির স্থানান্তর সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। তিনি দেখান যে, বড় ঘূর্ণির শক্তি কীভাবে ছোট ঘূর্ণির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষক ইয়ংজিয়াং হুয়াং ও তার দল ‘দ্য স্টারি নাইট’-এর ডিজিটাল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এর ব্রাশস্ট্রোক ও উজ্জ্বলতা কলমগোরোভের টার্বুলেন্স থিওরির সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, তরল প্রবাহে যখন শক্তি স্থানান্তর হয় তখন তা বিশৃঙ্খলভাবে ছোট ছোট অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এই একই প্যাটার্ন দেখা গেছে ভ্যান গঘের তুলির আঁচড়ে। এর অর্থ দাঁড়ায়, চিত্রকর্মটি শুধু কল্পনার ফসল নয় বরং বাস্তবতার গভীরতম স্তরের একটি প্রতিফলন।
ভ্যান গঘের এই বিশেষ ক্ষমতা শুধু ‘দ্য স্টারি নাইট’-এ সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকরা আরও কিছু চিত্রকর্ম ও প্রকৃতির ঘটনায় একই ধরনের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী জন কনস্টেবলের আঁকা ‘চেইন পিয়ার, ব্রাইটন’ ছবিতেও এই একই টার্বুলেন্স প্যাটার্ন দেখা যায়। এছাড়া ১৯৭৯ সালে নাসার ভয়েজার ১ মহাকাশযানের তোলা বৃহস্পতির গ্রেট রেড স্পটের ছবিতেও মিল পাওয়া গেছে। বৃহস্পতির এই মহা ঝড় কয়েক শতাব্দী ধরে সক্রিয় রয়েছে এবং এটি একটি প্রকৃত টার্বুলেন্সের নিদর্শন। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার। কারণ যদি আমরা প্রকৃতির জটিল টার্বুলেন্স বোঝার জন্য এই চিত্রকর্মগুলোর বিশ্লেষণ করতে পারি, তবে এটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বিমান চলাচলে ঝাঁকুনি কমানো এবং সমুদ্রস্রোতের গবেষণায় সহায়ক হতে পারে।
তবে গবেষক জেমস বিটি মনে করেন এটি প্রকৃত টার্বুলেন্স নয়। কারণ চিত্রকর্মটি নিজে কোনো গতিশক্তি বহন করে না। প্রকৃত টার্বুলেন্স এমন একটি প্রক্রিয়া যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং শক্তি স্থানান্তরিত করে। কিন্তু ভ্যান গঘের চিত্রকর্মটি স্থির, যেখানে কোনো গতির পরিবর্তন নেই। এটি নিশ্চিত যে ভ্যান গঘ প্রকৃতির গভীরতম জটিলতাকে অনুভব করেছিলেন। তার মনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আবেগ হয়তো তাকে এমনভাবে প্রকৃতিকে দেখতে সাহায্য করেছিল, যা সাধারণ মানুষ দেখে না। তিনি তার তুলির আঁচড়ের মাধ্যমে সেই বিশৃঙ্খলা ও শক্তির অনন্য প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
ভ্যান গঘের মানসিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল। তিনি সারাজীবন বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক সমস্যায় ভুগেছেন। ‘দ্য স্টারি নাইট’ চিত্রকর্মটি আঁকার সময় তিনি একটি মানসিক হাসপাতালে ছিলেন। এই মানসিক অবস্থার কারণে তার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ছিল, যা হয়তো তাকে বাস্তবতার জটিলতা অনুভব করার এক অনন্য শক্তি দিয়েছিল। গবেষকরা মনে করেন, শিল্প ও বিজ্ঞানের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক শিল্পী হয়তো অবচেতনভাবে প্রকৃতির বিভিন্ন জটিল প্যাটার্ন ও বিজ্ঞানকে ফুটিয়ে তোলেন তাদের চিত্রকর্মে। ভ্যান গঘের ক্ষেত্রে এটি আরও স্পষ্ট, কারণ তার তুলির আঁচড়ের প্যাটার্ন একেবারেই প্রকৃতির জটিল গতিবিদ্যার সঙ্গে মিলে যায়।


