গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমারে চার বছর ধরে লড়াই চলার পর সামরিক শাসন গোষ্ঠী ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তবে ভূমিকম্পের প্রভাব সামনের বছরগুলোতে চলমান সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত মার্চের ২৮ তারিখ মিয়ানমারের মধ্য সাগাইং অঞ্চলে আঘাত হানা ভূমিকম্পে অন্তত ৩ হাজার ৬৪৯ জন নিহত হয়। ভূমিকম্পে সাগাইং শহর ও আশপাশের মান্দালয় অঞ্চলে ঘরবাড়ি, কারখানা, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ধসে পড়ে; ভেঙে পড়ে সেতু, ফাটল ধরে সড়কে। ভূমিকম্পের ফলে সামরিক বাহিনীর অস্ত্র উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সেনাবাহিনীর গোলাবারুদ উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটার খবর এমন সময় এসেছে, যখন মিয়ানমারের সেনানিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। তবে মিয়ানমারের প্রধান শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর এখনও কড়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে সেনাবাহিনী। তারা শহরাঞ্চলে ঘাঁটি গেঁড়ে গ্রামাঞ্চলে নির্বিচারে বিমান হামলা চালাচ্ছে, জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রামগঞ্জ; যা জাতিসংঘের মতে, যুদ্ধাপরাধের শামিল। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত সাগাইং শহর এখনও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তবে এর চারপাশের গ্রামাঞ্চলের অনেকাংশ বিদ্রোহী গোষ্ঠী শাসন করছে। যেমন পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ); যারা বিদ্রোহী জোটের জাতীয় ঐক্য সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিসের ধারণা, ভূমিকম্প সেনাবাহিনীর কৌশলগত উদ্দেশ্য থেকে মনোযোগ সরাবে না। তিনি বলেন, “সেনাবাহিনী ত্রাণ কাজের জন্য বিরতি নিচ্ছে না। তারা আকাশ থেকে আক্রমণ অব্যাহত রাখবে এবং যেখানে সম্ভব, পিডিএফকে দুর্বল করতে স্থলপথে আক্রমণ চালাবে। “তবে রাখাইন রাজ্য, যেটি ভূমিকম্প থেকে বলতে গেলে অক্ষতই রয়েছে, এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র,” বলেন তিনি। রাখাইনে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সিত্তে এবং কিউকফিউ অঞ্চলের চারপাশে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ওই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন রয়েছে, যা মিয়ানমার থেকে চীন পর্যন্ত গ্যাস পরিবহন করে।
ডেভিস বলেন, আনুমানিক ৪০ হাজার সৈন্যের “আরাকান আর্মি মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল থেকে দেশটির কেন্দ্রস্থল মাগবি, বাগো ও ইয়াওয়েদি অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। তারা হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, যারা এই সংঘর্ষকে একদিকে বা অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রভাবিত করতে পারে।”
মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলীয় কায়াহ রাজ্যের এক বিদ্রোহী কমান্ডার বলেন, “ভূমিকম্প মিয়ানমারের শরণার্থী সম্প্রদায়ের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যারা আগে থেকেই যুদ্ধের ভার বহন করে চলেছে। যে পক্ষ জনগণের পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী, তারাই জনসমর্থন অর্জন করতে পারবে এবং সামনের লড়াইয়ে জয়ী হবে।” রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিয়াও সান হ্লাইং জানান, সেনাবাহিনী এখনও ভূমিকম্প পরবর্তী ধাক্কা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আর এই সুযোগে আরাকান আর্মি ও অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর জন্য আরও শহর দখলের পথ তৈরি হতে পারে।
“তবে দীর্ঘমেয়াদে ভূমিকম্প মিয়ানমারের ক্ষমতার ভারসাম্যে মৌলিক পরিবর্তন আনবে বলে আমার মনে হয় না।” ভূমিকম্প মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে বড় সঙ্কটে ফেলতে পারেনি সত্য, তবে জেনারেলদের ওপর মনস্তাত্বিক চাপ তৈরি করেছে। যে দেশে জ্যোতিষশাস্ত্র এবং কুসংস্কার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে পর্যন্ত প্রভাবিত করে, সেখানে অনেকেই এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ঐশ্বরিক শাস্তি হিসাবে দেখছেন ।ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি মনে করেন, অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থানের কারণ না হয়ে ভূমিকম্পটি একটি খারাপ লক্ষণ হিসাবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের কর্তৃত্ব হ্রাস এবং প্রকাশ্য সমালোচনার উত্থান ঘটাতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিয়াও সান হ্লাইং বলেন, কিছু সূত্র ইঙ্গিত দেয় যে সামরিক শাসনের পতনের পূর্বাভাস হিসেবে ভূমিকম্পকে প্রচারের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হলেও তা গৃহযুদ্ধকে প্রভাবিত করবে, এমনটা অনুমান করা কঠিন বলে মনে করেন হর্সি। তিনি বলেন, সংঘাতে জড়িত শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সম্ভবত ভূমিকম্পের পরে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে আরও অনিচ্ছুক হবে।


