ভুল তথ্য ও অপতথ্য কারা , কেন ছড়ায় !

সংবাদমাধ্যমসহ প্রচলিত মাধ্যমগুলোর বাইরে তথ্যের অবাধ প্রবাহের জায়গায় পরিণত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। যে কারও তথ্য দেওয়ার সুযোগ থাকায় এবং এসব তথ্য যাচাইয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এটি ভুল ও অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার বড় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রড়প্রায় সব জায়গায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমনকি ভুল ও অপতথ্যের কারণে জাতিগত ও ধর্মীয় দাঙ্গার মতো প্রাণঘাতী সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। বিবিসি বলছে, ভুল তথ্য হলো ভুয়া খবর, যা কেউ ভুলবশত করে থাকেন এবং ছড়িয়ে থাকেন, যিনি বুঝতে পারেন না এটি ভুয়া।

অপতথ্য হলো ভুয়া খবর, যা কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করে এবং ছড়িয়ে দেয়। ওই ব্যক্তি জানে, এটি ভুয়া খবর। মূলত সমস্যা সৃষ্টি করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যখন কেউ ভুয়া খবর তৈরি করে এবং ছড়ায়, সেটি হলো অপতথ্য। এর সঙ্গে ব্যক্তি বা কোনো বিষয়কে অসম্মান বা সমালোচনার বিষয়টি জড়িত থাকতে পারে। ৭০টি দেশে একটি গবেষণা চালিয়েছিল অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট। ২০২০ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, এর মধ্যে ৬২টি দেশেই জনমত পাল্টে দিতে অপতথ্য ব্যবহার করেছিল সরকারি সংস্থাগুলো। সংবাদমাধ্যমের ৫৫ হাজার প্রতিবেদন, ৫০ লাখ টুইট ও ৭৫ হাজার ফেসবুক পোেস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ‘মেইল ব্যালটের’ মাধ্যমে ভোেট কারচুপি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভিত্তিহীন দাবি ছড়িয়ে দিতে মূল ভূমিকা পালন করেছিল মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর একটি জরিপ চালায় রয়টার্স ইনস্টিটিউট। এতে ইন্টারনেটে কোনটি ‘সঠিক’ আর কোনটি ‘ভুয়া’ খবরড়এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ৬৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় রাজনৈতিক পক্ষ ও সাংবাদিকদের ছড়ানো ভুল ও অপতথ্য নিয়ে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা বিদেশি সরকারের চেয়ে নিজ দেশে সরকারের ছড়ানো অপতথ্য নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। মতাদর্শিক এজেন্ডা আছে, এমন গোষ্ঠীগুলো অপতথ্য ছড়িয়ে থাকে। যেমন জলবায়ু পরিবর্তন তত্ত্ব অস্বীকারকারী ও টিকাবিরোধী গোষ্ঠী। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে ভিন্নমত পোষণকারী গোষ্ঠীগুলোরও অপতথ্য ছড়ানোর নজির আছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের সম্পৃক্ততাও থাকে।

রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক এজেন্ডা ছড়িয়ে দিতে কিংবা আর্থিক সুবিধা পেতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক, তারকা ব্যক্তিত্ব ও ইনফ্লুয়েন্সাররা অপতথ্য ছড়ানোর কাজটি করে থাকতে পারেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এক চিকিৎসক কোভিড-১৯-এর টিকাকে ‘চিকিৎসা জালিয়াতি’ আখ্যা দিয়ে ৬০০টি কলাম লিখেছেন। সেগুলো বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আর্থিক সুবিধার জন্য বিভিন্ন কোম্পানি অপতথ্য ছড়াতে পারে। যেমন ওপেন ডেমোক্রেসি নামের একটি সংবাদমাধ্যম অভিযোগ করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভুল তথ্য ছড়াতে কিছু চিন্তন প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুবিধা দিয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠান।

অপতথ্য ছড়ানোর মূলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এর বৈশ্বিক নেটওয়ার্ককে দায়ী করে থাকেন গবেষক, সরকার ও শিল্প খাতের পক্ষগুলো। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ১৬ দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর জরিপ চালায় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইপসোস। এতে দেখা যায়, তাদের ৫৬ শতাংশেরই খবর পাওয়ার প্রধান উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আর ৬৮ শতাংশই জানায়, এখানে অপতথ্যের ছড়াছড়ি। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও অপতথ্য ছড়ানো হয়। কিছু ওয়েবসাইট তৈরি করাই হয় অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে। এসব সাইটের খবরের ধরন এবং খবরের বরাত দেখে প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের খবরের মতোই মনে হয়। নিউজগার্ড নামের একটি ওয়েবসাইট ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অপতথ্য ছড়ানো ৪৭১টি ভুয়া নিউজ সাইট শনাক্ত করেছে।

ছাপা পত্রিকা ও সম্প্রচারমাধ্যম, রাজনীতিবিদদের বক্তৃতা-বিবৃতি, আলাপ-আলোচনাসহ বিভিন্ন মাধ্যমেও অপতথ্য ছড়াতে পারে। যেমন কোনো গোষ্ঠী অন্যদের হেয় করতে প্রচারপত্র ও স্টিকার বিতরণ করতে পারে। অফলাইনে ছড়ানো অপতথ্য রোধ করাও কঠিন। কারণ, অনলাইনে তথ্য যাচাই-বাছাই করার কিছু ব্যবস্থা থাকলেও অফলাইনের অপতথ্যের বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অপতথ্য মোকাবিলায় একটি বড় উপায় হতে পারে সঠিক তথ্যের প্রবাহ বাড়ানো। সঠিক ও নির্ভরযোগ্য উৎসের বরাত দিয়ে অপতথ্যটিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে। তথ্য যাচাই ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে অপতথ্য ও এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন