আমরা যে সময়ের সাথে অভ্যস্ত তা পৃথিবীতে সাধারণত একরকম থাকে। কিন্তু যখন পৃথিবীর কক্ষপথে দ্রুত গতিতে ঘূর্ণায়মান স্যাটেলাইটগুলোর কথা আসে, তখন সময়ের গতিপথ কিছুটা ভিন্ন হয়ে যায়। এটিকে বলা হয় সময় প্রসারণ বা Time Dilation। এই সময় প্রসারণের প্রভাব জিপিএস ব্যবস্থার সঠিক কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময় প্রসারণের ঘটনা দুটি Special Relativity এবং General Relativity’র বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ঘটে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো বস্তু যত দ্রুত চলে, তার সাথে অন্য একটি পর্যবেক্ষককে তুলনা করলে তার জন্য সময় আবার ধীর গতিতে চলে। জিপিএস স্যাটেলাইটগুলোর গতিবেগ প্রায় ১৪,০০০ কিলোমিটার/ঘণ্টা (৮,৭০০ মাইল/ঘণ্টা)। এই উচ্চ গতিতে, স্যাটেলাইটগুলোর সময় পৃথিবী থেকে দেখা হলে ধীরগতিতেই চলে।
সাধারণ আপেক্ষিকতা বলে, মহাকর্ষের প্রভাবে সময়ের গতি পরিবর্তিত হয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠে মহাকর্ষ শক্তি বেশি। যেখানে কক্ষপথে স্যাটেলাইটগুলো অবস্থান করছে, সেখানে মহাকর্ষের প্রভাব কম। এর ফলে স্যাটেলাইটগুলোর ক্লক পৃথিবীর ক্লকের তুলনায় দ্রুত চলে।
বিশেষ এবং সাধারণ আপেক্ষিকতার এই দুইটি প্রভাব একত্রিত হয়ে জিপিএস স্যাটেলাইটের সময়ে একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করে। এর ফলে, স্যাটেলাইটের ঘড়ি প্রতি দিন পৃথিবীর সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৮ মাইক্রোসেকেন্ড দ্রুত চলে। এটা যদিও দেখতে খুবই সামান্য মনে হয়, তবে বাস্তবে এর ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি কিছু মাইক্রোসেকেন্ডের পার্থক্যও দিনের শেষে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ভুল পজিশনিংয়ের কারণ হতে পারে।
জিপিএস সিস্টেমের সঠিকতা বজায় রাখার জন্য এই সময়ের পার্থক্যগুলি খুবই সুনির্দিষ্টভাবে সংশোধন করা হয়। স্যাটেলাইটগুলোর ক্লকগুলি পৃথিবীতে পাঠানোর আগে বিশেষভাবে সংশোধন করা হয় যাতে তারা কক্ষপথে পৌঁছানোর পর পৃথিবীর সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ থাকে। এই প্রক্রিয়া এতটাই নিখুঁত যে স্যাটেলাইটগুলোর সময় প্রসারণ সত্ত্বেও সেগুলি পৃথিবীর সময়ের সাথে সমন্বিত থাকে এবং জিপিএস সিস্টেম সঠিকভাবে কাজ করে। সময় প্রসারণের প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত জটিল হলেও আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এর বড় প্রভাব রয়েছে। গাড়ির নেভিগেশন, বিমান চলাচল, সশস্ত্র বাহিনী এবং নানা ধরনের সেবা যে গুলোর জন্য সঠিক সময়ের প্রয়োজন, সেগুলো জিপিএস সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল।
যেমন গাড়ির নেভিগেশন, যখন আপনি আপনার গাড়ির নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছেন, জিপিএস স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সঠিক সময় অনুযায়ী আপনার অবস্থান নির্ধারণ করা হচ্ছে। যদি ৩৮ মাইক্রোসেকেন্ডেরও কিছু ভুল সময়ের পার্থক্য থাকে, তা কিলোমিটার ত্রুটির সৃষ্টি করতে পারে। এর মানে, যদি আপনি শহরের মধ্যে ৮০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে চলছেন, এর মধ্যে ৩৮ মাইক্রোসেকেন্ডের ছোট সময়ের পার্থক্যও আপনার অবস্থানকে পরিবর্তন করতে পারে। এটি একেবারে ছোট, কিন্তু যখন আপনি দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালাবেন, তখন এই ছোট পরিবর্তন আপনার রুটে বেশ বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভুল গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে।
বিমান চলাচলও জিপিএস ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একে ‘অটো-পাইলট’ সিস্টেমের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিছু মাইক্রোসেকেন্ডের ত্রুটি বিমান চলাচলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন বিমান এক শহর থেকে অন্য শহরে খুব দ্রুত যাচ্ছে।যদি সময়ের এই ত্রুটি না সংশোধন করা হতো, তবে বিমানটি ভুল স্থান বা ভুল উচ্চতায় গিয়ে দূর্ঘটনারও সম্মুকীন হতে পারতো।
সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অভিযানের কাজেও জিপিএস ব্যবহৃত হয়। তাদের যন্ত্রপাতি ও যানবাহন সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য এই সিস্টেম অপরিহার্য। বিমান, ট্যাঙ্ক, ড্রোন, কিংবা অন্য কোনো সেনা যানবাহন যখন গতি বা কার্যক্রম চালাচ্ছে, তখন জিপিএসের সাহায্যে তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে পারে। এছাড়াও বিশেষ অভিযানের সময় সেনাদের যদি দূরবর্তী অথবা অচেনা অঞ্চলে যেতে হয়, বিশেষত গভীর জঙ্গল, মরুভূমি, অথবা পাহাড়ি এলাকা যেখানে কোনো নির্দিষ্ট রাস্তাঘাট থাকে না সেখানে জিপিএস তাদেরকে সঠিক রুট নির্দেশ দিতে সাহায্য করে।


