বিভিন্ন সময় ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার ফিরে আসার গুজব রটানো হয়। তবে সত্যটা হলো, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা হয়নি। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের দেশত্যাগ; এমনকি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস মারা গেছেন বলেও গুজব রটানো হয়। যেদিন খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেন, সেদিনও গুজব রটানো হয় যে তিনি আর দেশে ফিরতে পারবেন না।
ইউটিউবে এমন অনেক ভিডিও ছড়ানো হয়েছে যেখানে শেখ হাসিনাকে সাক্ষাৎকার দিতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওগুলোতে তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা এ ধরনের কোনো সাক্ষাৎকার দেননি।
ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে খবর ও ‘টক-শো’র নামে কিংবা ইচ্ছামাফিক ভিডিও ও কনটেন্ট বানিয়ে এ ধরনের অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশের বড় একটি অংশের মানুষ এ ধরনের ‘খবরে’ বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এসব কনটেন্টের বড় একটি অংশই তৈরি করা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানোর উদ্দেশ্যে।
অনলাইনে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি বিশদভাবে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ইউটিউব কর্তৃপক্ষ এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। সরকারের দিক থেকেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির দেখা যায়নি।
আর দশটা সাধারণ ভিডিওর মতোই এসব ভুয়া ভিডিওতেও বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ‘ডলার’ আয় করছে ইউটিউব। নিয়ম অনুযায়ী বিজ্ঞাপনের আয়ের একটি অংশ পাচ্ছেন এসব কনটেন্ট নির্মাতারাও।
এতে দুই ধরনের লাভ হচ্ছে ভুয়া কনটেন্ট তৈরিতে জড়িতদের। প্রথমত, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হচ্ছে। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রীতিমতো সংগঠিতভাবে তাদেরকে দিয়ে এই কাজ করাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, যারা এসব কাজ করছেন তারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
উদ্বেগের ব্যাপার হলো যারা এসব ভুয়া খবরের ভিডিও দেখেন, ইউটিউবের ‘অ্যালগরিদম’ তাদের আরও বেশি করে এ ধরনের ভিডিও সামনে এনে দেয়। এর ফলে দর্শকরা অপতথ্যের অর্থাৎ ডিজিইনফরমেশনের এক গোলকধাঁধার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকেন।
সত্য-মিথ্যার মিশেলে তৈরি করা ভিডিও সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে তুলনামূলক বেশি বয়সীদের মধ্যে; যারা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম থেকে তথ্য যাচাই করেন না।
ইন্টারনেটে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কনটেন্ট তৈরিকারী এই গোষ্ঠীগুলোকে বলা হচ্ছে ‘বটবাহিনী’। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে ২০১৩ সালে শাহবাগে আন্দোলন শুরু হলে তাদের প্রতিপক্ষ ‘বাঁশের কেল্লা’ গ্রুপ তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হয়েছিল।
পরে বিভিন্ন সময় নেতাকর্মীদের অনলাইনে সক্রিয়তা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে আওয়ামী লীগের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। অপতথ্য ছড়ায় এমন অনেক ওয়েবসাইট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে এদের বিরুদ্ধে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ‘ডিপ-ফেক’ ভিডিও। ইউটিউবে এসব ভিডিওতে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে যাকে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে তার ঠোঁটের নড়াচড়া পর্যন্ত খাপ খেয়ে যাচ্ছে। যারা মানসম্মত দৈনিক সংবাদপত্র পড়েন না, তাদের অনেকের পক্ষে ডিপ-ফেক ভিডিও দেখে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা সম্ভব হয় না। তারা এগুলোকে সত্য ঘটনা বা খবর হিসেবে ধরে নেন।
ফেক নিউজের জামানার বহু আগে থেকেই বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ ছিল হলুদ সাংবাদিকতা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে সস্তা ধাঁচের এই সাংবাদিকতার উত্থান ঘটে। বিভ্রান্তিকর শিরোনাম, অতিরঞ্জিত গল্প, যৌন কেলেঙ্কারি, রোমহর্ষক অপরাধ নিয়ে কল্পনা মেশানো গল্প লিখে পাঠক ধরাই ছিল তখন মূল উদ্দেশ্য।
তার একশ বছর পর এখন চলছে ডিজিটাল মিডিয়ায় ‘ভিউ ও হিট’ বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আর এতেই বাড়ছে ‘ভাইরাল’ হওয়া কিংবা করার প্রবণতা। এর সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হলো বাড়তি পাওনা।
রোববার তথ্য উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলম বলেছেন, বাংলাদেশে যে গুজব-অপতথ্য আছে, সেটা শুধু সেন্ট্রালি বা ভারত থেকে আসে, এ রকম না। তিনি আরও বলেন, ‘একটা অপতথ্য বা একটা মিথ্যা নিউজ শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি করে না; বরং একটা সোসাইটির পুরো ফেব্রিকটা নষ্ট করে দেয় এবং বাংলাদেশে এটা শুরু হয়েছে।’ (প্রথম আলো, ৪ মে ২০২৫)
অপতথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় কার্যকর সরকারি উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। কীভাবে এই প্রবণতা ঠেকানো যায় সে ব্যাপারেও সরকারের ভেতর কোনো আলোচনার কথা শোনা যায় না। এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের অপতথ্য থেকে সুরক্ষিত রাখতে একমাত্র ভরসা ব্যক্তিগত সচেতনতা।


