ভিন গ্রহে জীবনের অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিভঙ্গি

ভিন গ্রহের জীবন নিয়ে আলোচনা আমাদের মধ্যে প্রায়ই চলে। বিশেষ করে সম্প্রতি কিছু সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, আমরা যে কোনো সময় ভিন গ্রহের জীবনের সন্ধান পেতে পারি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক মাধ্যমে বলা হয়েছিল, “এটি শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার।” ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আবার শিরোনাম ছিল, “আমরা কাছাকাছি আছি।” সংবাদে এমন আশাবাদী মন্তব্যগুলো সাধারণত মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করে, তবে এই বিষয়ে বিজ্ঞানী মহলের দৃষ্টিভঙ্গি কি? তারা কীভাবে এই সম্ভাবনার বিষয়ে ভাবেন? তাদের কি কোনো একক মতামত বা সম্মতি রয়েছে? সম্প্রতি নেচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে যা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত একদল গবেষক চারটি জরিপ পরিচালনা করেছেন। এই জরিপে তারা অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট (যারা ভিন গ্রহে জীবন নিয়ে গবেষণা করেন) এবং অন্যান্য শাখার বিজ্ঞানীদের মতামত সংগ্রহ করেছেন। মোট ৫২১ জন অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট এবং ৫৩৪ জন অন্য শাখার বিজ্ঞানী তাদের জরিপের জন্য উত্তর দিয়েছেন। গবেষণার ফলাফল বিশেষভাবে দৃষ্টান্তমূলক ছিল। ফলাফল অনুযায়ী ৮৬.৬% অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট এবং ৮৮.৪% অন্যান্য বিজ্ঞানী মনে করেছেন, ভিন গ্রহে জীবনের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। শুধু ২% বিজ্ঞানী অসম্মত হয়েছেন এবং ১২% বিজ্ঞানী নিরপেক্ষ ছিলেন। এর মানে অধিকাংশ বিজ্ঞানীর, মহাবিশ্বে কোথাও না কোথাও ভিন গ্রহে জীবন রয়েছে, এমন একটি শক্তিশালী সম্মতি রয়েছে।

তবে যখন প্রশ্ন ওঠে “ভিন গ্রহে কি জটিল বা বুদ্ধিমান জীবন রয়েছে?” তখন বিষয়টি একটু ভিন্ন। জটিল জীবনের বিষয়ে ৬৭.৪% এবং বুদ্ধিমান জীবনের বিষয়ে ৫৮.২% বিজ্ঞানী সম্মতি জানিয়েছেন। সুতরাং যদিও অধিকাংশ বিজ্ঞানী মনে করেন ভিন গ্রহে জীবনের অস্তিত্ব থাকতে পারে, তবে তাদের মধ্যে কিছু মনে করেন যে, সেখানকার জীবন সম্ভবত খুব সহজ বা প্রাথমিক স্তরের হতে পারে। মাত্র ১০.২% অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্টই মনে করেন, বুদ্ধিমান জীবনের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় সাধারণভাবে বিজ্ঞানীরা ভিন গ্রহের জীবনের অস্তিত্বের ব্যাপারে একমত, কিন্তু জটিল বা বুদ্ধিমান জীবনের ব্যাপারে তাদের মতামত কিছুটা ভিন্ন।তবুও বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু “থিওরিটিক্যাল” প্রমাণের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ভিন গ্রহে জীবন সম্ভব।

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। প্রায় ১২% বিজ্ঞানী নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিলেন, কারণ তারা মনে করেছিলেন যে, ভিন গ্রহে জীবনের অস্তিত্বের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এটি বৈজ্ঞানিক সুরক্ষার অংশ। গবেষণায় “নিরপেক্ষ” ভোেট দেওয়া প্রায়ই বিজ্ঞানীদের জন্য একটি নিরাপদ বিকল্প হয়ে থাকে, কারণ এতে তাদের কোনো ভুলের সম্ভাবনা থাকে না। এমনকি তারা সঠিক বা ভুল সিদ্ধান্ত না নিয়েও ভবিষ্যতের নতুন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের মতামত পরিবর্তন করতে পারেন।

আরও একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ফলাফল উপস্থাপন করা যেতে পারে। যদি আমরা নিরপেক্ষ ভোেটগুলো বাদ দিয়ে দিই, তাহলে ৪৬১টি ভোটের মধ্যে ৪৫১টি “সম্মত” বা “পুরোপুরি সম্মত” ভোেট হয়েছিল। এতে সম্মতির হার দাঁড়ায় ৯৭.৮%। বিজ্ঞানীরা জানেন যে, “নিরপেক্ষ” নির্বাচন করলে তারা কখনো ভুলে যেতে পারবেন না, তাই এটি একটি নিরাপদ পন্থা। তবে এটা যে শুধু সুরক্ষা নয়, বরং গবেষণার সঠিক পথ অনুসরণও হতে পারে, তা বলা যায়। এখান থেকে আমরা গ্যালাক্সি এবং আরও বৃহত্তর মহাবিশ্বে বাসযোগ্য পরিবেশের একটি আসল সংখ্যাকে সাধারণভাবে বুঝতে পারি। আমরা আরো জানি যে, জীবন অ-জীবন থেকে শুরু হতে পারে-এই ঘটনা পৃথিবীতে ঘটেছে। যদিও প্রথম সহজ জীবন সৃষ্টির উৎস এখনো অস্পষ্ট, তবে এমন কোনো কারণ নেই যা জীবন শুরু হতে অত্যন্ত বিরল পরিস্থিতি প্রয়োজন বলে দাবি করতে পারে। যদি তা হয়ও, তবে জীবনের উৎপত্তির সম্ভাবনা (অ্যাবিওজেনেসিস) অবশ্যই শূন্য নয়।

ভিন গ্রহে জীবনের অস্তিত্বের বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সম্মতির হার উচ্চ হলেও, এটি অবশ্যই সরাসরি প্রমাণের ভিত্তিতে নয়, বরং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে এসেছে। এমনকি জীবনের সৃষ্টি হতে পারে এমন সংখ্যাধিক্য বাসযোগ্য পরিবেশের কারণে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে, একই সাথে বিজ্ঞানীরা এমন কোনো দাবি করছেন না, যা এখনও পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত হয়নি। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা তাদের অজানা বিষয়ে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করতে চান। সবশেষে যখন এই ধরনের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়, তখন দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তথ্য উপস্থাপন করা উচিত-একটি যেখানে নিরপেক্ষ ভোেট সহ এবং একটি যেখানে নিরপেক্ষ ভোট ছাড়া। এটি গবেষণার সঠিক বিশ্লেষণ এবং পরিসংখ্যানের আসল জটিলতা সঠিকভাবে তুলে ধরবে।

ভিন গ্রহের জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এক ধরনের সম্মতি রয়েছে, তবে এটি সবসময় সরাসরি প্রমাণের ওপর নির্ভর করে না। এই গবেষণা আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছেন, এবং নতুন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের ভবিষ্যত সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারে।





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন