অনেকদিন ধরেই আমরা শুনে এসেছি ভালো কোলেস্টেরল (এইচডিএল) মানেই হৃদরোগের বিরুদ্ধে এক নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস আর জীবনযাপনের নানা ভালো অভ্যাসের সঙ্গে ভালো কোলেস্টেরলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যাচ্ছে গল্পটা অতটা সরল নয়। হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষক জেরেমি ফুরটাডো এবং তার দল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা করেছেন—ভালো কোলেস্টেরল যদি হৃদরোগ কমায়, তবে কেন এইচডিএল বাড়ানোর ওষুধগুলো তেমন কোনো সুফল আনতে পারেনি? গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত তাদের গবেষণা বলছে, আসলে সব ভালো কোলেস্টেরল সমান নয়!
গবেষণায় দেখা গেছে, এইচডিএলেরও অনেক উপপ্রজাতি আছে যার প্রত্যেকটির প্রোটিন-কাঠামো আলাদা। কিছু উপপ্রজাতি সত্যিই হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে, আবার কিছু কোনো উপকার করে না বরং ঝুঁকি বাড়ায়! বিশেষ করে, যেসব এইচডিএল উপপ্রজাতিতে অ্যাপোলিপোপ্রোটিন সি৩ বা আলফা-২-ম্যাক্রোগ্লোব্যুলিন থাকে, সেগুলো স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, অ্যাপোলিপোপ্রোটিন ই বা সি১ যুক্ত উপপ্রজাতি আমাদের হার্টের জন্য সত্যিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
তাই দেখা যাচ্ছে, রক্তে এইচডিএলের সংখ্যা বাড়ানো মানেই স্বাস্থ্যের উন্নতি নয়। বরং জানতে হবে কোন ধরনের এইচডিএল বাড়ছে। এর ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো সিইটিপি নিরোধক ওষুধ। এগুলো রক্তে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়ালেও, ক্লিনিকাল ট্রায়ালে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ব্যর্থ হয়। কারণ ওষুধগুলো ভালো এবং খারাপ দুই ধরনের উপপ্রজাতিকেই বাড়িয়ে দেয়।
এই নতুন তথ্য আমাদের জীবনধারার পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দেয়। এখন থেকে কেবল রক্তে কোলেস্টেরলের সংখ্যা নয়, তার গুণগত মানও বিবেচনা করতে হবে। ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম—এসব অভ্যাস যেহেতু প্রাকৃতিকভাবে শরীরের ভালো উপপ্রজাতির বৃদ্ধি ঘটায়, তাই এগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল। জেরেমি এবং তার দল বলছেন, এইচডিএল শুধু কোলেস্টেরল বহন করে না, এর রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ইমিউন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মতো ক্ষমতাও। কাজেই সামনে গবেষকরা চেষ্টা করবেন নির্দিষ্ট করে এমন খাদ্য এবং জীবনধারা চিহ্নিত করতে, যেগুলো আমাদের শরীরে সঠিক উপপ্রজাতির ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করবে।
তাদের নতুন গবেষণা শিগগিরই প্রকাশিত হবে, যেখানে জানানো হবে কোন ধরনের খাদ্যাভ্যাস হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে কার্যকর। এই তথ্যগুলো আমাদের শেখাচ্ছে, স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে হলে শুধু পরিমাণ নয়, গুণগত দিকেও নজর দিতে হবে। আর এই চর্চা শুরু হতে পারে প্রতিদিনের সহজ কিছু অভ্যাস থেকে—সুষম খাবার, নিয়মিত হাঁটা, মানসিক চাপ কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম। কারণ স্বাস্থ্য সচেতন জীবনযাপনই আসলে আমাদের হৃদয়ের আসল বন্ধু।


