ভাবুন তো আপনি আপনার প্রিয় গায়িকার গান শুনছেন। ইউটিউবে লক্ষ লক্ষ ভিউ, ইনস্টাগ্রামে ঝলমলে ছবি, টিকটকে ভাইরাল ট্রেন্ড সবকিছু দেখে আপনি মুগ্ধ। কিন্তু হঠাৎ জানতে পারলেন, এই গায়িকা আদৌ মানুষই না। তাঁর গলা, মুখ, পোশাক সবই ডিজিটাল। এমনকি তিনি ক্লান্ত হন না, ভুল বলেন না, বিতর্কে জড়ান না। তিনি নিখুঁত, কারণ তিনি তিনি শুধুই কোড, অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফল। এটাই এখন বাস্তব। আর এর কেন্দ্রে আছে একটি নাম: Noonoouri।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মান ডিজাইনার জোর্গ জুবার এই ভার্চুয়াল চরিত্র Noonoouri তৈরি করেন । প্রথম দিকে ফ্যাশন-ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত হলেও, হঠাৎ করেই সংগীত জগতে পা রাখে এই চরিত্রটি। Warner Music-এর সঙ্গে চুক্তি করে সে, আর প্রকাশ পায় তার প্রথম গান “Dominoes”। এই গানটি কণ্ঠ দিয়েছে AI, যার ভয়েস ক্লোন করা হয়েছে একটি বাস্তব মানুষের কণ্ঠ থেকে। তবে বাস্তবের কোনো উপস্থিতি নেই। শুধু ডিজিটাল পার্সোনা, নিখুঁত রূপ, আর একটি কল্পিত জীবনযাপন।
Noonoouri গান গায়, মডেলিং করে, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের হয়ে কাজ করে এবং সবসময় সামাজিক বার্তাবহ হয়ে ওঠে। সে নারীবাদ, পরিবেশ-সচেতনতা কিংবা প্রাণী অধিকার নিয়ে কথা বলে তাও নিখুঁতভাবে, কোনো বিতর্ক ছাড়াই এবং তার ফলোয়ার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে তারকা ব্র্যান্ডের অংশীদারিত্ব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ডিজাইনারদের প্রচারে অংশগ্রহণ সবই এক নিখুঁত প্রোগ্রামড পরিকল্পনার ফল।
এই ঘটনাগুলো কেবল বিনোদন বা কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং পুরো সংগীতশিল্পের জন্য এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা। Noonoouri-এর উত্থান আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে তারকা মানেই কি এখন মানুষ? না কি একটি সুনির্মিত ব্র্যান্ড-চরিত্রও এখন শিল্পের ভবিষ্যৎ?
একজন ভার্চুয়াল শিল্পী তৈরি হয় একাধিক ধাপে। প্রথমে ডিজিটাল সফটওয়্যারের সাহায্যে চরিত্রের গঠন ও রূপ নির্ধারণ করা হয়। এরপর AI ভয়েস ক্লোনিং ব্যবহার করে কণ্ঠ বানানো হয়। এরপরে গানের কম্পোজিশন, ভিডিও সম্পাদনা ও বাজারজাতকরণ সবকিছুই ঘটে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায়। আর সবশেষে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে উপস্থাপন করা হয় এমনভাবে যেন সে আমাদেরই মতো। যেন আমরা ভুলে যাই সে একজন কাল্পনিক অস্তিত্ব।
এই ধরনের চরিত্রগুলো এত জনপ্রিয় হচ্ছে কেন? কারণ তারা কখনো ক্লান্ত হয় না, ভুল করে না, বিতর্কে জড়ায় না। তাদের পেছনে কাজ করছে একটি দক্ষ টিম যারা প্রতিমুহূর্তে বিশ্লেষণ করছে ট্রেন্ড, ডিজাইন করছে নতুন গানের স্টাইল, সাজাচ্ছে নতুন ভিডিও কনসেপ্ট। এক কথায় তারা একটি সর্বদা সক্রিয়, নিয়ন্ত্রিত ব্র্যান্ড। আর নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে Gen Z, এই ডিজিটাল পার্সোনা নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই মিশে যাচ্ছে। তাদের কাছে বাস্তবতা আর ভার্চুয়ালের সীমারেখা আগেই ঝাপসা হয়ে গেছে।
Noonoouri একা নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার K-pop ইন্ডাস্ট্রিতেও ভার্চুয়াল সদস্য নিয়ে গঠিত গার্ল ব্যান্ড ‘MAVE:’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তাদের সদস্যরা AI দ্বারা নির্মিত এবং গানগুলোও প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি হচ্ছে। এশিয়া থেকে ইউরোপ এই নতুন ধারা তরুণ শ্রোতাদের একধরনের প্রযুক্তিনির্ভর রোমাঞ্চ দিচ্ছে।
কিন্তু এই উত্থানের পেছনে কী হারিয়ে যাচ্ছে? মানব শিল্পীদের জায়গা কি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে? উত্তরটি সহজ না, কিন্তু চিন্তার বিষয় অনেক। একটি AI শিল্পী দিনে দশটা গান তৈরি করতে পারে, প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক অ্যালগরিদম অনুযায়ী কন্টেন্ট তৈরি করে এবং প্লে-টাইম বাড়ানোর জন্য নিজেকে সবদিক থেকে পরিবর্তন করতে পারে। সেখানে একজন মানব শিল্পীর পক্ষে এত দ্রুততা ও নমনীয়তা রাখা সম্ভব নয়। ফলে রেকর্ড কোম্পানি, ব্র্যান্ড, এমনকি প্ল্যাটফর্মগুলোও ধীরে ধীরে এই AI শিল্পীদের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে।
তবে মানব শিল্পীরা এখনো একটি বড় শক্তি। তারা লাইভ কনসার্টে গান গায়, দর্শকদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে অনুভূতির আদানপ্রদান করে। তাদের ব্যর্থতা, মানসিক যন্ত্রণা, সাফল্যের লড়াই সবই মানুষকে স্পর্শ করে। এই স্পর্শ AI কখনোই পরিপূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
সীমাবদ্ধতা স্বত্বেও গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সাররা ব্র্যান্ডের জন্য চমৎকার ROI দেয়, বেশি ইন্টারেকশন আনতে পারে।
পৃথিবীর বড় বড় এজেন্সিগুলো আজ এই ভার্চুয়াল তারকাদের নিয়ে সিরিয়াস ইনভেস্টমেন্ট করছে। যেমন, লিল মিকেলা নামে আরেকজন ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সার যিনি ২০১৬ সাল থেকে ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় এবং এখন মিলিয়ন ফলোয়ারের মালিক। Noonoouri তাদেরই আধুনিক উত্তরসূরি আরও উন্নত, আরও গতিশীল, এবং আরও পরিপূর্ণরূপে বাজারমুখী।
তাহলে কি এই AI শিল্পীরা আমাদের সাংস্কৃতিক জগতে মানব শিল্পীদের স্থান দখল করে নেবে? নাকি তারা একসাথে সহাবস্থান করবে? অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতের সংগীতে মানুষ ও মেশিন একত্রে কাজ করবে। একজন মানব গায়ক হয়তো একদিন মঞ্চে গান গাইবেন একজন ডিজিটাল শিল্পীর সঙ্গে। তাদের সম্মিলিত সৃষ্টিতেই জন্ম নেবে নতুন এক সঙ্গীতজগৎ।
Noonoouri আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির যুগে তারকা হওয়া মানেই কেবল প্রতিভা নয়, বরং এক সুপরিকল্পিত নির্মাণ। আর এই নির্মাণ যদি মানুষের বাইরেও সম্ভব হয়, তবে শিল্পের সংজ্ঞা কি পরিবর্তিত হচ্ছে? এই প্রশ্নটাই আজকের সংগীতচর্চার কেন্দ্রবিন্দু।


