“… ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের মতো উভয়ের গোলাগুলিতেও মানসিকভাবে নিরপেক্ষ বা নির্মোহ থাকতে পারেন না বাংলাদেশ-সমাজ। এটা কেবল ধর্মের কারণে ঘটে না, ভৌগলিক অতীতের কারণেও হয়। যা আবার পুরোপুরি অতীত হয়েও যায়নি।
সামাজিক স্তরে অবস্থাটা অনেক সময় এমনই মনে হয় যে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ভারত যেন পারস্পরিক ঝগড়ায় লিপ্ত একটা যৌথ পরিবার। ‘অতীত’ এই তিন সমাজকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করেছে, কিন্তু পৃথক ‘বর্তমান’ তাদের নিরাসক্ত করতে পারেনি।…এই সম্প্রদায়গত উত্তেজনা এখনো অমীমাংসিত পরিচয়গত প্রশ্নগুলোর প্রতিফলন, যা উপমহাদেশের বিভাজনের বেদনাদায়ক ইতিহাস ও তার পরবর্তী পরিণতি থেকে এখনও মানুষের মনে সক্রিয়।
… পাকিস্তানে গোলা ছোঁড়ার পাশাপাশি ভারত যুদ্ধের প্রথম দিনই তার আঁচ ছড়িয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তেও ব্যাপকভাবে ‘পুশইন’ কর্মসূচি নিয়ে।…খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার, কুড়িগ্রামসহ অনেক সীমান্তে…শত শত মানুষকে ইতোমধ্যে তারা পুশইন করতে সমর্থ হয়েছে। দরিদ্র প্রকৃতির এই মানুষদের একাংশ বাংলাভাষী এবং তাদের গুজরাট অঞ্চল থেকে ধরে এনে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো—বাংলাভাষী হলেই কি কেউ বাংলাদেশি হয়ে যায়? আর, ভারতে যদি অবৈধভাবে কোনো বাংলাদেশি থাকেন, সেই বিষয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলে কথাবার্তা বলা যেতো। তার বদলে যেভাবে সীমান্তের অনেকগুলো জায়গা দিয়ে একযোগে পুশইন কর্মসূচি নেওয়া হলো, তা উসকানিমূলক।
… পুশইন সামাল দিতে নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের সামনে পুশব্যাক কর্মসূচি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, সেটা অমানবিক হলেও। পাল্টাপাল্টি পুশইন ও পুশব্যাক সীমান্ত পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করতে বাধ্য। সে কারণেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি তবে পাকিস্তান সীমান্তের মতো বাংলাদেশ সীমান্তেও উত্তেজনা ছড়াতে চায়?
… এখানকার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে ভারত সরকার তার জন্য সুখকর মনে না করার কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সেজন্য পুরো দেশকে এবং এখানকার সব মানুষকে জড়িয়ে লাগাতার অসত্য প্রচারণাকে এক ধরনের পদ্ধতিগত বৈরিতা হিসেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।
… ভারতের দিক থেকে ক্রমাগত এরকম বৈরী প্রচারণা এবং ব্যাপক হারে পুশইন চেষ্টার পাশাপাশি দক্ষিণ সীমান্তেও উত্তেজনাকর এক অবস্থায় পড়েছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আরাকান থেকে নতুন করে রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ বেশ বেড়ে গেছে।…নতুন শরণার্থী দল বলছে, আরাকান আর্মির রাখাইন গেরিলাদের তরফ থেকে তাদের জন্য নিরাপত্তাহীনতার চাপ তৈরি হয়েছে।
… যুদ্ধ পরিস্থিতি সেখানে মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে। তার উত্তর হিসেবে জাতিসংঘ সম্প্রতি বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে আরাকান অভিমুখী একটা ‘করিডোর’ বা ‘চ্যানেল’ খুলে দেওয়ার জন্য, যা দিয়ে তারা আরাকানে ‘আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা’ পাঠাতে চায়।
… বাংলাদেশেও আরাকানমুখী করিডোর প্রস্তাব শুরু থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। অনেকগুলো প্রশ্ন উঠেছে এ নিয়ে।…দেশে পার্লামেন্ট থাকলে এ বিষয়গুলো নিয়ে নিশ্চিতভাবে জনপ্রতিনিধিরা কথা বলতেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার স্পর্শকাতর এ বিষয়ে রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও আলোচনা করেনি বলেই মনে হচ্ছে।
… সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা…অসমন্বিত ও বিরোধাত্মক এসব বক্তব্যে জনমনে এই মর্মে উদ্বেগ বাড়ছে যে, বাংলাদেশ তার দক্ষিণ সীমান্তে সামরিক ধাঁচের কোনো উদ্যোগে জড়াচ্ছে কি না।
… গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত এই সরকারের পেছনে জনগণের সমর্থন থাকলেও এটা অনির্বাচিত সরকার। আবার পাশাপাশি দেশে বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। নির্বাচন কবে হবে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছড়াচ্ছে। এরকম অবস্থায় আরাকানের দিকে মানবিক চ্যানেল দেওয়ার বিষয় নির্বাচনকেন্দ্রীক অনিশ্চয়তায় বাড়তি উপাদান হয়ে গেছে।
তাছাড়া, সীমান্তে করিডোরের সামরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে যেকোনো সময়। সবমিলে দেশের সব সীমান্তের চলমান অবস্থা এবং পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সামাজিক ফলকে বিবেচনায় নিলে উদ্বিগ্ন হতে হয়। …”


