ভারতের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারতকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমিত করে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এর ঠিক পরদিনই, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং জানান, একজন মার্কিন মন্ত্রিসভার সদস্য ভারতের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’-এর পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন – যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ-এর প্রকাশিত বক্তব্যে এধরনের মন্তব্য প্রতিফলিত হয়নি।
রুবিও এই আলোচনার বার্তা দিয়েছেন গত বুধবার (৩০ এপ্রিল) রাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে ফোনে আলাপকালে। একই দিন তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গেও কথা বলেন এবং ২২ এপ্রিল পহেলগামে হওয়া সন্ত্রাসী হামলার তদন্তে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রুবিও “ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা হ্রাস করতে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এই “ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা”-তে দুঃখ প্রকাশ করে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।
ভারত সরকার থেকে ফোনালাপ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে জয়শঙ্কর এক্স (টুইটার)-এ এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় বলেন, তিনি রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং লেখেন: “এই হামলার পরিকল্পনাকারী, মদতদাতা ও সংগঠকদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে।” অন্যদিকে, রুবিও পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী হামলার তদন্তে সহযোগিতা করার এবং উত্তেজনা প্রশমনে ভারতের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতি অনুযায়ী, রুবিও ও শরিফ সন্ত্রাসী হামলাকে “নিন্দনীয়” বলে অভিহিত করেন এবং উভয়পক্ষ সন্ত্রাসীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, “তিনি পাকিস্তানকে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনে, সরাসরি যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করেছেন।” এর ঠিক একদিনেরও কম সময় পরে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে রাজনাথ সিং টুইট করে জানান, তিনি হেগসেথের সঙ্গে কথা বলেছেন – যার বক্তব্য ছিল ভিন্ন। সিং টুইটে বলেন, পাকিস্তানের “সন্ত্রাসবাদে সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের ইতিহাস রয়েছে।” সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, সিং দাবি করেন যে — “হেগসেথ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এবং ভারতের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করে” এবং তিনি “ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের জোরালো সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।”
যদি সত্যিই হেগসেথ এমন মন্তব্য করে থাকেন, তবে তা ভারতের সামরিক পদক্ষেপের জন্য একপ্রকার অনুমোদন হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। পরে ওয়াশিংটনে হেগসেথ একটি টুইটে বলেন, “গত সপ্তাহের নৃশংস সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণহানির ঘটনায় আমি ব্যক্তিগতভাবে গভীর শোক জানাই।” “আমি জোরালো সমর্থন জানিয়েছি। আমরা ভারত ও তার মহান জনগণের পাশে আছি,” তিনি লেখেন। তবে তাঁর টুইটে আত্মরক্ষার অধিকারে সরাসরি সমর্থনের কথা উল্লেখ ছিল না, যা সিং-এর পোস্টে দাবি করা হয়েছে। যদি হেগসেথ এমন কিছু বলে থাকেন, তবে তা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও হোয়াইট হাউসের সতর্ক ও ভারসাম্যমূলক বক্তব্য থেকে সরে আসা বোঝায়।
বাস্তবে, রুবিও সন্ত্রাসবিরোধী বিষয়ে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ঐক্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করলেও, তাঁর সুর ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই, যিনি এই সংকটের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় আরও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউস প্রকাশিত একটি অডিও ক্লিপে ট্রাম্প বলেন, “আমি ভারতের খুব কাছের এবং পাকিস্তানেরও কাছের। তারা হাজার বছর ধরে কাশ্মীরে লড়াই করছে। কাশ্মীরের এই সংঘাত হাজার বছরের পুরোনো, সম্ভবত তার চেয়েও বেশি। ওই হামলাটা খুবই খারাপ ছিল।”
‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ নামে একটি সংগঠনের সামাজিক মাধ্যমে এই হামলার দায় স্বীকার করার খবর প্রকাশিত হলেও পরে তারা দাবি করে, তাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছিল। ভারতের দাবি, টিআরএফ পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বার ছদ্মবেশী সংগঠন। পাকিস্তান দাবি করে আসছে, ভারত ২০১৬ ও ২০১৯ সালের মত প্রতিশোধমূলক সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে – যা অভিযানের সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে।


