ভারত সরকার নতুন একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থলবন্দর ব্যবহার করে চার ধরনের পাটপণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। এর ফলে দেশটিতে বাংলাদেশি পাটপণ্য রপ্তানি কার্যত সীমিত হয়ে এসেছে। প্রজ্ঞাপনের আওতায় থাকা পণ্যের মধ্যে রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্যের কাপড়, পাটের দড়ি বা রশি, পাটজাত পণ্য দিয়ে তৈরি দড়ি বা রশি এবং পাটের বস্তা বা ব্যাগ। নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, এই পণ্যগুলো ভারতে পাঠাতে হলে সমুদ্রপথ ব্যবহার করে মুম্বাইয়ের নভসেবা বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি করতে হবে।
জানা গেছে, স্থলবন্দর ব্যবহার করে ভারতে রপ্তানি করা পণ্যের প্রায় ৯৮ ভাগই আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেত। গত জুনে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর স্থলবন্দর ব্যবহার করে কিছু পাট ও পাটজাত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করায় ইতিমধ্যেই রপ্তানি সংকুচিত হয়ে এসেছিল। এখন এই নতুন প্রজ্ঞাপন কার্যকর হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যে, সমুদ্রপথ ব্যবহার করে রপ্তানি কতটা কার্যকরভাবে অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স এসোসিয়েশনের ডিরেক্টর ও রাজবাড়ী জুট মিলসের চেয়ারম্যান শেখ শামসুল আবেদিন জানান, স্থলবন্দর ব্যবহার করে পাটপণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আসলে যেটুকু পণ্য যাওয়ার সুযোগ ছিলো সেটাও বন্ধ করে দেওয়া হলো।” ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন। এছাড়াও আগে এই পণ্যগুলো ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের বাজারে রপ্তানি হতো, কিন্তু এখন অতিরিক্ত শুল্কের কারণে রপ্তানি হুমকির মুখে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ী মনে করছেন, ভারতের স্থলবন্দর ব্যবহার করে আমদানি নিষিদ্ধ করার ফলে ভারতীয় আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়বে। এতে বাংলাদেশের পাটপণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফরহাদ আহমেদ আকন্দ বলেন, “এখন ভারতের আমদানিকারকদের খরচ বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
অর্থনীতিবিদ ডঃ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ বিষয়ে বলেন, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে খরচ অনেক বেশি হওয়ায় ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পাটপণ্যের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে এবং রপ্তানিকারকদের দাম কমিয়ে পণ্য বিক্রি করতে হতে পারে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, একেবারে রপ্তানি বন্ধ হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, “ভারতের বিধিনিষেধের নেতিবাচক প্রভাব থাকবে, কিন্তু এটি রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে ঠিক করা সম্ভব। নির্বাচিত সরকার যদি আলোচনার মাধ্যমে স্থলপথে রপ্তানি পুনঃপ্রবেশের পথ তৈরি করে, তবে পরিস্থিতি সমাধানযোগ্য।”
এর আগে ভারতের কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয় এবং গত মে মাসে স্থলবন্দর ব্যবহার করে কিছু পণ্যের আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে স্থলবন্দর ব্যবহার করে রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশের আয় প্রায় ১৫ কোটি ডলারের কাছাকাছি ছিল। এর মধ্যে প্রায় সমস্ত পণ্যই স্থলবন্দর ব্যবহার করে ভারতে গিয়েছিল।
পাট অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ১২টি দেশে প্রায় ১০৯৭ কোটি টাকার কাঁচাপাট রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ভারতই ছিল প্রধান বাজার, যেখানে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭০৯ কোটি টাকার পাট।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে, তবে ভারত সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, যদি স্থলপথে রপ্তানির সুবিধা পুনরায় না পাওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের পাটখাতের রপ্তানি আয় কিছুটা কমতে পারে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য পরিবহন খরচ বাড়বে।


