মুসলিম সম্পত্তি আইনে ওয়াক্ফ হলো দাতব্য ট্রাস্টের মতো। একজন ব্যক্তি তার সম্পত্তি দাতব্য বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ওয়াক্ফ করতে পারেন। একবার সম্পত্তি ওয়াক্ফ করলে, এর আর ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে না। যে উদ্দেশ্যে সম্পত্তি ওয়াক্ফ করা হয়েছে তা পরিবর্তন করা যায় না। এটিকে বিধিবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন রয়েছে। এই আইনের অধীনে ওয়াক্ফ বোর্ড এসব সম্পত্তি পরিচালনা করে। ভারতে ওয়াক্ফ বোর্ডের মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৯.৪ লাখ একর যা বাংলাদেশের সিলেট বা টাঙ্গাইল জেলার আয়তনের চেয়েও বেশি। ভারতের রেলওয়ে এবং সামরিক বাহিনীর পর কোনো সংস্থার অধীনে থাকা এটাই সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি। মসজিদ, কবরস্থান, মাজারের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য এসব সম্পত্তি দান করা হয়েছে।
মোদি সরকারের ভাষ্য, ওয়াক্ফ বোর্ড বছরের পর বছর ধরে তাদের সম্পত্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করেনি। জমির আয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও জনকল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু এটা হচ্ছে না বলে ওয়াক্ফ আইন সংশোধন করা প্রয়োজন। ভারতের মুসলমানদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা জানার উদ্দেশ্যে গঠন করা সাচার কমিটির ২০০৬ সালের প্রতিবেদনও বলা হয়েছিল, ওয়াক্ফ সম্পত্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে সেই সময়ে তাদের আয় ১২ হাজার কোটি টাকা হতো। ওয়াক্ফ বোর্ডে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কথা উঠে এসেছিল ওই প্রতিবেদনে। সাচার কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওয়াক্ফ সম্পত্তির অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, বেদখল এবং দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে প্রত্যাশিত আয় আসে না। এসব সম্পত্তি থেকে স্বল্প আয়কে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের আর্থিক ও সামাজিক পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ হিসেবেও চিহ্নিত করে সাচার কমিটি।
কিন্তু বিজেপি সরকার কি সত্যি-ই সৎ উদ্দেশ্য থেকে এই আইন সংশোধন করল, নাকি বরাবরের মতো ভোটের মাঠে মেরুকরণ ঘটানোই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য? এই প্রশ্ন তুলেছেন লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিরোধী দলের সদস্যরা। ওয়াক্ফ আইন সংশোধনের সবচেয়ে বিতর্কিত ধারাগুলোর একটি হলো, এখানে একজন অমুসলিমকে ওয়াক্ফ বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিতর্কিত ধারা অনুযায়ী, রাজ্যগুলোর ওয়াক্ফ বোর্ডে নিজ নিজ রাজ্য সরকার অন্তত দুজন অমুসলিমকে নিয়োগ দিতে পারবে।
পুরোনো আইন অনুযায়ী, কোনো সম্পত্তি ওয়াক্ফ ঘোষণার একমাত্র অধিকারী ছিল ওয়াক্ফ বোর্ড। নতুন আইনে সেই অধিকার দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসক বা সমপদমর্যাদার কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে। সেই সঙ্গে শত শত বছর ধরে যেসব জমি ওয়াক্ফ বোর্ডের অধীনে রয়েছে কিন্তু কোনো কাগজপত্র নেই—এসব জমি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন মুসলিম নেতারা। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর থেকে উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রাচীন মসজিদের জায়গা নিয়ে যেভাবে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে, দেশের সরকারপ্রধানসহ সংখ্যাগুরুদের অনেকের ভাষায়-আচরণে সংখ্যালঘু মুসলিমদের যেভাবে প্রান্তিক করে তোলার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তাতে সংশোধিত আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ওয়াক্ফ সম্পত্তি নিয়েও যে ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা হবে না, সেটা কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়?


