বাংলাদেশি মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ভোটে কনসলিডেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হতে পারে। এছাড়াও সম্ভবত ভারত এখনও শেখ হাসিনা বাদে বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
ভারতীয় মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় বাংলাদেশের দানবায়নের একটি প্রচেষ্টা চলছে। প্রচার করা হচ্ছে, বাংলাদেশ একটি তালিবানি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।হিন্দুদের ধরে ধরে হত্যা করা হচ্ছে। জয় বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিজয় দিবস উদযাপিত হচ্ছে না। চঞ্চল চৌধুরীর মতো অভিনেতাকে গৃহবন্দি করা হয়েছে। শাঁখা সিঁদুর পরে পথে বেরুতে পারছেন না হিন্দু মহিলারা। এই সংগঠিত প্রচারগুলির মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গের সমাজে বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রবল বিদ্বেষ এবং ঘৃণা তৈরি হয়েছে। মেইনস্ট্রিম অতি দক্ষিণপন্থী মিডিয়ায় চট্টগ্রাম দখলের কথা বলা হচ্ছে। ‘বাংলাদেশ থাকবে না’ বলা হচ্ছে। এগুলি জনগণকে প্রভাবিত করছে।
একইসঙ্গে আমি এ কথাও বলব, বাংলাদেশেও এমন বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলি দুটি দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকারক। ভারতের পতাকা পদদলিত করার মতো ঘটনা ঘটেছে। প্রাক্তন সেনাকর্তারা চারদিনে কলকাতা দখল করার কথা বলছেন। এগুলি দুদেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভারতের যেমন অতি অবশ্যই বাংলাদেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতে হবে। ঠিক তেমনই অন্তর্বতীকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদাধিকারী যদি ভারতের কিছু অঞ্চল ‘অ্যানেক্স’ করার কথা বলেন, সেটিও অতীব দুর্ভাগ্যজনক। একজন সরকারি ব্যক্তি এমন কথা বললে তার আন্তর্জাতিক প্রভাব ভালো হয় না।
বাংলাদেশের অন্তর্বতীকালীন সরকারের সঙ্গেও ভারতের সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে বলে আমি আশাবাদী। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ভারত চায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে। এটি আশাপ্রদ। … দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারতীয় মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার বিরাট অংশ এখন অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির মাউথপিসে পরিণত হয়েছে। তারা সবসময়ই একটি ‘other’ নির্মাণ করতে চায়। কখনও সেটি চীন, কখনও পাকিস্তান, কখনও বাংলাদেশ। আবার কখনও দেশের ভেতরেই কোনো শক্তি। এই ‘অপর’ এর দানবায়ন করাই থাকে প্রধান লক্ষ্য।
এর সঙ্গে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পক্ষে জনমত গড়ে তোলার বিষয়টিও আছে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক হলো তথাকথিত ‘লিবারাল’ ভারতীয় মিডিয়া উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে একই বয়ান উৎপাদন করছে। ফেক নিউজের ছড়াছড়ি চলছে।সংখ্যাগুরুর সমর্থন নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি কার্যকর পদ্ধতি বলে ভাবছেন মিডিয়ার মাথারা। বাংলাদেশে যা ঘটছে, তাকে অনেকখানি বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। কিন্তু কিছু যে ঘটছে, তাও সত্য।
… ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থানের জন্য বাংলাদেশ বিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজি। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। বাংলাদেশি মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ভোটে কনসলিডেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হতে পারে। এছাড়াও সম্ভবত ভারত এখনও শেখ হাসিনা বাদে বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ফলে এক ধরনের অনিশ্চয়তার বোধ আছে।
… ফেইক নিউজ ডিবাংক করার মাধ্যমে আমরা দুদেশের মানুষের কাছেই সত্য তুলে ধরতে পারি এছাড়া মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সচেতন প্রচেষ্টা জরুরি। আমরা যেমন ভারতে বাংলাদেশের পতাকার অবমাননার বিরুদ্ধে কথা বলছি, তেমন ভাবেও যদি বাংলাদেশেও ভারতীয় পতাকার অবমাননার প্রতিবাদ হয়, সেটি সদর্থক হবে। বাংলাদেশের পতাকাও যেমন কেবল শেখ হাসিনার নয়, ভারতীয় পতাকাও কেবল নরেন্দ্র মোদির নয়, সিএএ এনআরসি বিরোধী শাহিনবাগের আন্দোলনকারীদের হাতেও এই পতাকা ছিল, কৃষক আন্দোলনকারীদের হাতেও ছিল এই পতাকা। …বাংলা আউটলুকের সঙ্গে সাক্ষাৎকার সংক্ষেপ


