বিটলসের ‘শান্ত বিটল’ নামে পরিচিত জর্জ হ্যারিসনের জীবনযাত্রা ছিল চমকপ্রদ ও বহুমাত্রিক। পশ্চিমা রকসংগীতের প্রতীক হয়ে ওঠা এই গিটারিস্ট কিভাবে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ক্রমশই ভারতের আধ্যাত্মিকতায় ডুবে গেলেন সে এক রহস্য। হ্যারিসনের সংগীতে, দর্শনে, জীবনযাপনে ভারতীয় সংস্কৃতি, সেতার ও হিন্দুধর্ম গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৬৫ সালের দিকে জর্জ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি প্রথমবার ‘Norwegian Wood’ গানে সেতার ব্যবহার করেন। এটি ছিল পশ্চিমা রকের ইতিহাসে প্রথমবার ভারতীয় কোনো বাদ্যযন্ত্রের সংযোজন। কিন্তু সেতারকে সত্যিকারের উপলব্ধি করতে হলে তো প্রয়োজন গুরু! ১৯৬৬ সালে লন্ডনে ভারতীয় কিংবদন্তি সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে পরিচিত হন জর্জ। এই পরিচয় শুধু সংগীতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না এটি তাকে ভারতের আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করিয়েছিল।
জর্জ একসময় বলেছিলেন- “ সংগীতে আমি এমন কিছু খুঁজছিলাম যা আরও গভীর, আরও কোমল ও আন্তরিক।” রবিশঙ্কর তাকে কেবল সেতার বাজানোই শেখাননি শিখিয়েছেন ভারতীয় সংগীতের অন্তর্নিহিত আত্মিক দিক। সেতার বাজানোকে ধ্যানের মতো দেখতেন জর্জ।দিনের পর দিন রবিশঙ্করের সঙ্গে বসে রাগ অনুশীলন করতেন। ১৯৬৭ সালে জর্জ ও বিটলসের অন্যান্য সদস্যরা মহারিষি মহেশ যোগীর ট্রান্সেন্ডেন্টাল মেডিটেশন সম্পর্কে জানতে পারেন। ১৯৬৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা ভারতের রিশিকেশে মহারিষির আশ্রমে ধ্যানচর্চার জন্য যান। এই সফর বিটলসের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। রিশিকেশে পৌঁছানোর পর বিটলসের জীবনযাপন যেন সম্পূর্ণ বদলে গেল। এখানে তারা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধ্যান করতেন। নিরামিষ খাবার খেতেন এবং প্রকৃতির মাঝে নিজেদের হারিয়ে ফেলতেন।
এই সময়েই বিটলস তাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অ্যালবাম ‘The White Album’-এর বেশ কয়েকটি গান লিখেছিলেন। ‘Dear Prudence’, ‘Blackbird’, ‘Mother Nature’s Son’-এগুলো ছিল রিশিকেশে লেখা গান।কিন্তু কিছুদিন পর জন লেনন ও পল ম্যাককার্টনি মহারিষির আচরণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আশ্রম ত্যাগ করেন। জর্জ থেকে যান, এবং আরও বেশি আধ্যাত্মিক চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন সত্যিকারের শান্তি বাইরের জগতে নয়, নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। তাকে হৃদয় খুঁড়ে বের করতে হবে। রিশিকেশ থেকে ফিরে আসার পর জর্জ ভারতীয় আধ্যাত্মিকতাকে নিজের জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে এলেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ইস্কন (ISKCON – International Society for Krishna Consciousness) আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭০ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গান ‘My Sweet Lord’ হরে কৃষ্ণ মন্ত্রের প্রতি তার ভালোবাসার প্রতিফলন। তিনি শুধু গান গেয়েই থামেননি ইস্কনের ইউরোপীয় মন্দিরগুলোর জন্য বড় অংকের অর্থ দান করেন এবং কৃষ্ণভক্তিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করেন। জর্জ হ্যারিসনের সংগীত ক্রমশ আধ্যাত্মিক হয়ে উঠতে থাকে। ‘All Things Must Pass’ (১৯৭০) অ্যালবামটিতে তার আধ্যাত্মিক চিন্তার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গানগুলোর মূলভাব ছিল জীবনের নশ্বরতা ও ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ। ‘Living in the Material World’ (১৯৭৩) এ তিনি বলেন কিভাবে এই পৃথিবী শুধুমাত্র এক পার্থিব ভ্রমণ, এবং সত্যিকারের অস্তিত্ব খুঁজতে গেলে মায়ার জগত ছাড়তে হয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় জর্জ হ্যারিসন মানবতার প্রতি তার দায়বদ্ধতাও প্রকাশ করেন। রবিশঙ্করের অনুরোধে তিনি ‘Concert for Bangladesh’ সংগঠিত করেন। যা ছিল বিশ্বের প্রথম চ্যারিটি কনসার্ট। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এই কনসার্টে বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টারসহ বিশ্বের বড় বড় তারকারা অংশ নেন। এই কনসার্টের মাধ্যমে বাংলাদেশি শরণার্থীদের সহায়তায় ব্যাপক তহবিল সংগ্রহ করা হয় এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় বাংলাদেশের বিপর্যয়ের প্রতি। জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার সংহতির অনন্য নিদর্শন।
১৯৪৩ সালে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে ২৫ই ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা জর্জ হ্যারিসন ১৯৯৭ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। মৃত্যু নিয়ে তিনি কখনো ভয় পাননি। অসুস্থতা যেন শান্তি দিতে আধ্যাত্মিকতার দুয়ার আরো খুলে দিয়েছিলো। ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তার কানে ভগবদ গীতার শ্লোক বাজানো হয়েছিল। জর্জ হ্যারিসনের জীবন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যেখানে সংগীত, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার এক অপূর্ব সংযোগ ঘটেছে। তিনি ছিলেন এক সেতুবন্ধনকারী যিনি ভারতীয় সংগীত ও দর্শনকে পশ্চিমা দুনিয়ায় জনপ্রিয় করেছিলেন।


