মণিপুরী নৃত্য “জাগোই” নামে পরিচিত ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা। এর উৎস উত্তর-পূর্ব ভারতের মণিপুর রাজ্যে। এই নৃত্য শুধু একটি শিল্পরূপ নয়, এটি মণিপুরের জনগণ, তাদের সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মণিপুরী নৃত্যশৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর কোমলতা, সাবলীলতা এবং আধ্যাত্মিক গভীরতা।
মণিপুরী নৃত্যের শিকড় খোঁজার জন্য আমাদের মণিপুরের পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ফিরে যেতে হবে। এর সবচেয়ে আদি রূপটি হলো “লাইহারাউবা” নৃত্য, যা মণিপুরের আদিবাসী মৈতৈদের এক প্রাচীন ধর্মীয় উৎসব। এই নৃত্যের মাধ্যমে লাই (দেবতা) ও সানাই (দেবী)-এর সৃষ্টিলীলা উদযাপন করা হতো। লাইহারাউবা নৃত্য প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটায় এবং এখানে দেহের নড়াচড়া ছিল মৃদু ও প্রতীকী।
পরবর্তীতে ১৭শ ও ১৮শ শতকে বৈষ্ণব ধর্মের আগমন মণিপুরী নৃত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই পরিবর্তনের মূল কারিগর ছিলেন মণিপুরের রাজা ভাগ্যচন্দ্র (১৭৬৩-১৭৯৮)। তিনি বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করার পর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার লীলাকে কেন্দ্র করে “রাসলীলা” নৃত্য প্রবর্তন করেন, যা মণিপুরী নৃত্যের অন্যতম প্রধান অংশ। রাজা ভাগ্যচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় মণিপুরী নৃত্য একটি সুসংগঠিত এবং শাস্ত্রীয় রূপ লাভ করে। তাঁর পরবর্তী রাজারাও এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং বিভিন্ন নতুন শৈলী ও রীতিনীতি অন্তর্ভুক্ত করেন, যা বর্তমান মণিপুরী নৃত্যের ভিত্তি স্থাপন করে।
মণিপুরী নৃত্যের শৈলী অন্যান্য ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের চেয়ে ভিন্ন। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর শান্ত ও কোমল আঙ্গিক। এই নৃত্যে তীব্র এবং দ্রুত নড়াচড়া নেই বললেই চলে। নৃত্যশিল্পীরা ঢেউয়ের মতো শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালন করেন, যা দেখে মনে হয় যেন তারা বাতাসে ভাসছেন। মণিপুরী নৃত্যশৈলীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেহভঙ্গি, পদসঞ্চালন, মুদ্রা ও সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্র।
নৃত্যশিল্পীরা প্রায়শই হাঁটুর উপর ভর দিয়ে বসেন এবং হাত ও পায়ের নড়াচড়া অত্যন্ত সাবলীল ও মৃদু হয়। এই নৃত্য মাটির সাথে সংযুক্ত থাকে, যা প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। নৃত্যে পদসঞ্চালন খুব মৃদু এবং প্রায়শই নীরব থাকে। নৃত্যশিল্পীরা পায়ের আঙুল বা গোড়ালির উপর জোর দেন না, যা ভরতনাট্যম বা কত্থকের মতো নৃত্যশৈলী থেকে একে সুস্পষ্টভাবে আলাদা করে।
মণিপুরী নৃত্যে ব্যবহৃত মুদ্রার সংখ্যা অন্যান্য শাস্ত্রীয় নৃত্যের তুলনায় কম। তবে কিছু মৌলিক মুদ্রা ব্যবহার করা হয়, যা বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে।এর সাথে মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি যোগ করে সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ করা হয়। মণিপুরী নৃত্যের সাথে পরিবেশিত সঙ্গীত রাগ-ভিত্তিক। প্রধান বাদ্যযন্ত্র হলো মৃদঙ্গ, যা “পুং” নামে পরিচিত। এছাড়াও বাঁশি, করতাল এবং মন্দিরা ব্যবহার করা হয়। গানের কথা বেশিরভাগই বৈষ্ণব ধর্মীয় সাহিত্য, যেমন রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, শ্রীচৈতন্যের জীবন এবং ভগবানের লীলা থেকে নেওয়া হয়।
মণিপুরী নৃত্যের পোশাক এক অত্যাশ্চর্য শিল্পকর্ম। এর উজ্জ্বল রঙ এবং জটিল নকশা নৃত্যশিল্পীর সৌন্দর্য ও পরিবেশনার মানকে বহুলাংশে বাড়িয়ে তোলে। নারীদের প্রধান পোশাক হলো “পোটলোই” নামক একটি বিশেষ ধরনের স্কার্ট। এই স্কার্টটি শক্ত সিল্কের তৈরি এবং নিচের দিকে স্ফীত থাকে।এর উপর সূক্ষ্ম সূচিকর্ম এবং আয়নার কাজ করা হয়, যা নৃত্য চলাকালীন আলো প্রতিফলিত করে এক জাদুকরী আভা তৈরি করে। এছাড়াও মাথার উপর একটি স্বচ্ছ ওড়না থাকে, যা “ইন্নাফি” নামে পরিচিত। নারী নৃত্যশিল্পীরা তাঁদের চুলকে সুন্দরভাবে বিন্যস্ত করেন এবং ফুলের মালা ও গয়না দিয়ে সাজান। পুরুষ নৃত্যশিল্পীরা যারা শ্রীকৃষ্ণ বা অন্যান্য পুরুষ চরিত্র হিসেবে নৃত্য করেন, তারা হলুদ বা সবুজ ধুতি এবং একটি মুকুট পরিধান করেন, যা ময়ূরের পালক দিয়ে সাজানো থাকে।
মণিপুরী নৃত্য শুধুমাত্র একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মণিপুরের মানুষের জন্য একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন। এই নৃত্যের মূল ভিত্তি হলো বৈষ্ণব ধর্ম, বিশেষ করে গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদ। এই নৃত্য শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার প্রেমলীলা এবং অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনী বর্ণনা করে, যা মণিপুরের ধর্মীয় জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। রাসলীলা নৃত্য বছরে বেশ কয়েকবার অনুষ্ঠিত হয়, ভগবানের প্রতি ভক্তদের ভক্তি ও ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম। এই নৃত্য শুধুমাত্র মন্দিরে নয়, সামাজিক অনুষ্ঠানে এবং উৎসবেও পরিবেশিত হয়। এটি মণিপুরের সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ঐতিহ্যকে বহন করে।
আধুনিক যুগে মণিপুরী নৃত্যের প্রসারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯১৯ সালে সিলেট ভ্রমণের সময় তিনি মণিপুরী নৃত্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং এর কোমলতা ও সৌন্দর্য তাঁর শিল্পকর্মে এক নতুন মাত্রা যোগ করে । রবীন্দ্রনাথ মণিপুরী নৃত্য শেখানোর জন্য শান্তিনিকেতনে মণিপুরী গুরুদের আমন্ত্রণ জানান, যেমন গুরু বুদ্ধিমন্ত সিং। পরবর্তীতে নীলেশ্বর মুখার্জ্জীও শান্তিনিকেতনে যোগ দেন । পরবর্তীতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য হিসেবে এটি সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজস্ব নৃত্যনাট্য ও শিল্পকর্মে মণিপুরী নৃত্যের ভাব ও ভঙ্গিমা ব্যবহার করেন। তাঁর গানে ও কাব্যে মণিপুরী নৃত্যের সুরের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় ।
মণিপুরী নৃত্য কেবল একটি শিল্পশৈলী নয়, এটি মণিপুরের জনগণ, তাদের বিশ্বাস, ধর্ম এবং সংস্কৃতির একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এর কোমলতা, আধ্যাত্মিক গভীরতা এবং শৈল্পিক সৌন্দর্য এটিকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের এক অনন্য আসনে স্থাপন করেছে। এই শিল্পকে সংরক্ষণ ও প্রচার করা কেবল মণিপুরেরই নয়, সমগ্র ভারতীয় সংস্কৃতির দায়িত্ব। মণিপুরী নৃত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিল্প এবং সংস্কৃতি মানব জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। এই নৃত্যশৈলী প্রমাণ করে, শিল্পের মাধ্যমে মানব আত্মা তার সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি খুঁজে পেতে পারে।


