“বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ও কাব্যচিন্তার মৌল সদৃশতা” : সৌভিক রেজা, লেখক ও সাহিত্য সমালোচক

বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে বাঙালি পাঠকের একটা বেশ বড়ো অংশের রয়েছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সমীহ। সেই অর্থে তাঁকে নিয়ে এখনো পর্যন্ত নেতিবাচক সমালোচনা খুব বেশি নেই। এর একটা কারণ হচ্ছে, বুদ্ধদেবের সাহিত্যচিন্তার মধ্যে রাজনীতির অংশটা তুলনামূলকভাবে কম; কখনো-কখনো নেই বলেই মনে হয়। ভাববাদী সমালোচনাকে তিনি একটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন, সেটিকে একটি স্বীকৃত আকৃতি দিয়েছিলেন। এছাড়া গতিশীল প্রাণবান জীবনের বহমান সৃষ্টিশীলতার যে-কথাটি নানাভাবে বলা হয়, তার অনবদ্য একটি নমুনা আমরা বুদ্ধদেব বসুর মধ্যে দেখতে পাই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে খানিকটা জড়িয়ে গিয়েছিলেন। এ-সম্পর্কে অনেক পরে বুদ্ধদেব স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, ‘সুখের হয়নি আমার পক্ষে, যুদ্ধকালীন কলকাতার সেই যোড়বহুল রাজনীতি … কোনো তৎকালিক বিষয়ে … আমার একফোঁটা উৎসাহ নেই। আমি পাই না সেই বাতাসের ছোঁওয়া যাতে অস্পষ্ট রেণু উড়ে বেড়ায়, সেই অর্ধালোক যেখানে কল্পনা খেলা করতে পারে।’ আর তারপরই বুদ্ধদেব তাঁর সেই জৈবনিক পর্বের ইতি টেনে নিজের অভিজ্ঞতার সারসংকলন করেছেন এইভাবে – ‘অনেক বিক্ষেপ ও বিশৃঙ্খলা ও সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে, উদ্যমের অনেক অপব্যয় ও আবেগের অনেক ব্যর্থতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে আমার অনুভূতি হলো যে সব গতি ও প্রগতি ও পতন ও বিতর্কের পরে অবশেষে কোনো-এক গভীর রাত্রে নিজের মধ্যে নিবিষ্টতা ভালো।’

বলা যায়, এই নিবিষ্টতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বুদ্ধদেব বসুর যাবতীয় সাহিত্যকর্মের প্রার্থিত ও প্রাণময় চেতনা। তাঁর মৌলিক সৃষ্টিপ্রতিভার সমস্ত উৎসমুখ সেখান থেকেই উৎসারিত হয়েছে, হয়েছে বিকশিত আর উৎসিক্ত। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পদাতিক কাব্যের আলোচনার উপসংহারেও তিনি বলেছিলেন, ‘দুদিক বজায় রাখা চলবে না। … হয় তাঁকে [সুভাষ মুখোপাধ্যায়] কর্মী হতে হবে নয়তো কবি।’

এসবের মানে এইটি নয় যে, বুদ্ধদেব বসু নির্বিকারভাবে তাঁর সাহিত্যচিন্তাকে গ্রহণ করেছিলেন, যার মধ্যে শুধু কল্পনার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। আত্মজিজ্ঞাসাকে তিনি বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন আর তাঁর সাহিত্যচিন্তার মধ্যে আমরা সেই আত্মজিজ্ঞাসারই একটি সদর্থক ও সকর্মক অভিযান দেখতে পাই। আর সেসবের সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছিলেন সাহিত্যচিন্তার দ্ব্যর্থময় দ্যুতি, যাকে কখনো-কখনো একজন সাহিত্যিকের, একজন সৃষ্টিশীল মানুষের চৈতন্যের জাগরণ হিসেবে অভিহিত করতে চেয়েছেন। আর তিনি দৃঢ়ভাবে এই বিশ্বাসে স্থিত হয়েছিলেন যে, ‘চৈতন্য মানেই আধ্যাত্মিকতা’। এসবের সঙ্গে ধর্মের কোনো সরাসরি সংযোগ নেই, যদিও কখনো-কখনো নিজেকে তিনি সরাসরি ‘হিন্দু’ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। বরিস পাস্তেরনাক যেমন স্বীকার করেছিলেন, ‘খ্রিষ্ট এসেছিলেন আমার কাছে, তাঁকে না পেলে এই যুগের যন্ত্রণা আমি সহ্য করতে পারতাম না।’ তাঁর কবিতার মধ্যেও আমরা সেই স্বীকারোক্তির কাব্যিক নমুনা দেখতে পাই –

ক্ষান্ত কলরোল। আমি বেরিয়ে আসি রঙ্গমঞ্চে।
দরজার খুঁটিতে হেলান দিয়ে
দূর প্রতিধ্বনি থেকে আন্দাজ করে নিতে চাই
আমার আয়ুষ্কালের আসন্ন ঘটনাগুলিকে।
হাজার দূরবীনের দৃষ্টি ধারে-ধারে
আমাকে তাক করে আছে রাতের অন্ধকার।
আব্বা, পিতা, যদি সম্ভব হয়
আমার এই পাত্র হোক হস্তান্তরিত।
(অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু)

অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসুর ভাষ্য হচ্ছে এ-রকম : ‘আমরা হিন্দু, আমাদের পক্ষে নিজেদের বা অন্যদের কোনো ধর্মই আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।’ কেন সম্ভব নয়? – সেটি আরো বিশদে গিয়ে বুদ্ধদেব বলেছেন, ‘পৌত্তলিক আমরা, আমাদের কাছে সবই রূপ হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে রূপক বা প্রতীক; আমরা জানি যে ধ্যান ভিন্ন মুক্তির পথ নেই।’ আর সেইসঙ্গে তিনি সেই ধ্যানের গুণ ও ক্রিয়া সম্পর্কে নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করেছিলেন এইভাবে : ‘ধ্যানের লক্ষ্য যা-ই হোক, তাতে এসে যায় না; হোক না তা নারী, বা কবিতা, বা দেবতা।’ হাঙ্গেরির নোবেলজয়ী লেখক ইমরে কার্তেজ (Imre Kertesz : 1929 – 2016) তাঁর নিজের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে বলতে গিয়ে একবার জানিয়েছিলেন, ‘My Jewsishness is shaped by the Holocaust. I do not speak Hebrew, I did not have a religious education… I am not familiar with Jews philosophy’ আর এসব বলতে গিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত নিজেকে একজন ‘non-Jewish Jew‘ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

বুদ্ধদেবের উপলব্ধির সঙ্গে এই যে অন্য দেশের লেখকদের ভাবনার সামীপ্য, সেটি তাঁর সাহিত্যচিন্তার সামূহিক সিদ্ধান্তকেই যেন এক ধরনের পূর্ণতা প্রদান করে থাকে। কেননা এই সাহিত্যচিন্তার মধ্যে দিয়ে একজন লেখকের বহুমুখী প্রতিভার যে-দায়িত্বের ভার, সেটি প্রকাশিত হতে থাকে। বুদ্ধদেব বসুর বেলাতেও সেটি ঘটতে দেখা গিয়েছে। আত্মজিজ্ঞাসার উপান্তে পৌঁছে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন –
কিছুই সহজ নয়, কিছুই সহজ নয় আর।

লেখা, পড়া, প্রুফ পড়া, চিঠি লেখা, কথোপকথন,
যা-কিছু ভুলিয়ে রাখে, আপাতত, প্রত্যেহের ভার।

দুরূহ, নূতনতর, ক্ষমাহীন দায়িত্বের ভার।
কিছুই সহজ নয়, কিছুই সহজ নেই আর।
(‘দায়িত্বের ভার’)

একজন লেখকের দায়িত্বের সেই ভার বিষয়ে সচেতন ছিলেন বলেই, সাহসে ভর দিয়ে, লিখতে পেরেছিলেন ‘শুধু তা-ই পবিত্র, যা ব্যক্তিগত। গভীর সন্ধ্যায়/ নরম আচ্ছন্ন আলো; হলদে-ম্লান বইয়ের পাতার/ লুকোনো নক্ষত্র ঘিরে আকাশের মতো অন্ধকার।’ বলা যায়, ব্যক্তিগত পবিত্রতায় নিজেকে সমর্পিত করতে পেরেছিলেন বলেই বুদ্ধদেবের সাহিত্যচিন্তার মধ্যে দায়িত্বের ভারের পাশাপাশি একজন সাহিত্যিকের আত্মমর্যাদার বোধটুকুও প্রকাশিত হতে থাকে।

সাহিত্যের প্রতি, নিজের লেখালেখির প্রতি বুদ্ধদেব বসুর ভালোবাসা ছিল অনেকটা কিংবদন্তির মতো। কোনো অবস্থাতেই তিনি লেখার কলমকে ত্যাগ করেননি। তিনি এটিও বিশ্বাস করতেন যে, ‘যদি কখনো মনে হয় যে কবিতার উৎস আছে শুকিয়ে, তার জন্যে ঘটনার ঘনঘটাকে কেন দায়ী করবো – তার কারণ খুঁজতে হবে নিজেরই মধ্যে।’ পাশাপাশি এটিও তিনি আমৃত্যু মনে রেখেছিলেন ‘যে-কোনো সময়ে, কবিকে জয়ী হতে হবে মানুষের উপর, নয়তো কবিতা সম্ভব হবে না।’ কবিকে তিনি মনে করতেন, ‘মরমী, ভাবুক, ঈশ্বরের জন্যে সতৃষ্ণ।’ আজকের দিনের কবি হলেন ‘জটিল চঞ্চল বিক্ষুব্ধ জগতের কেন্দ্রবাসী এক নিঃসঙ্গ মানুষ।’ কবি অ্যাডোনিস (Adonis : 1930) নিজের লেখালেখির বিষয়ে বলতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ‘When I don’t write, I feel as if I don’t exist. Through writing I find out who I am, I learn to discover and disclose myself.’

বুদ্ধদেবের ভাবনাও অ্যাডোনিসের এই ভাবনার চেয়ে আলাদা কিছু ছিল না। সেজন্যেই তিনি একান্তভাবে লেখালেখির মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করতে পেরেছিলেন। এটি শুধু তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল না, সেইসঙ্গে এর মধ্যে দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত মোক্ষের সন্ধানও করে গিয়েছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন