বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস–২০২৫ উপলক্ষে ৪ এপ্রিল জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সংবাদপত্রের সম্পাদকেরা বক্তব্য দেন। সভাপতির বক্তব্যে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেন, ‘শেখ হাসিনার শাসনামল এত জনধিক্কৃত হয়েছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল না। আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং আরও অনেক আইনের শিকার হয়েছিলাম। তবে বর্তমানে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা অথবা সহিংসতা-সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে মামলা চলছে। এটা কীভাবে সম্ভব? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও ২০০ বা কিছু বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল।
এটার অর্থ এই নয় যে কেউ দোষ করেননি। দোষ করে থাকলে সঠিকভাবে মামলা করে শাস্তি দেন এবং আমরা কোনোভাবেই তাঁর পাশে দাঁড়াব না, যদি সত্যিকার অর্থে সমাজের বিরুদ্ধে বা জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান সে রকম থাকে। কিন্তু আজকে ছয় থেকে সাত মাস হয়েছে, তাঁরা এসব মামলায় পড়েছেন। একটি কদমও এগোয়নি তদন্তের ব্যাপারে। ১৩ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার আছেন। তাঁরা যদি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তাঁদের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু আজকে সাত মাস, আট মাস ধরে কারাগারে, তাঁরা জামিন পাচ্ছেন না। এখন মামলার যে প্রবণতা, তাতে ১০০ জন, ৫০ জন, ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা, তার মধ্যে একজন সাংবাদিকের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হলো।
আইন উপদেষ্টা বলেন, আমাদের কিছু করার নেই, জনগণের অধিকার আছে মামলা করার। মেনে নিলাম মামলা করার অধিকার। কিন্তু কোনো আইনের যদি অপপ্রয়োগ হয়, তাহলে কি সরকার কিছু করবে না? সেখানেই আমার বড় প্রশ্ন।’ আলোচনা সভায় মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘যে দেশে প্রশ্ন করার জন্য সাংবাদিকের চাকরি যায়, সে দেশে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালন করছি আমরা। অবাক লাগে, আমি বিস্মিত হই, জানি না, আমি কাকে দায়ী করব?…তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে অনেকখানি। এক বছর আগে যে অবস্থা ছিল, সেই অবস্থা এখন আর নেই। অনেকখানি বদলেছে।’
সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘গণতন্ত্র যদি সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। চিন্তাভাবনাগুলো গণতান্ত্রিক করতে হবে।…সংবাদমাধ্যমগুলোতে আমার কথা বললে ঠিক আছে, আর আমার কথা না বললে ঠিক নেই, এই চিন্তাভাবনাও গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করবে না।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকুক আর না থাকুক, বিএনপি গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করবে। কখনোই অন্যায়ভাবে অন্যের মতকে চাপিয়ে দেওয়াকে সমর্থন করব না।’
মির্জা ফখরুল আরো বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা আতঙ্কিত থাকি সাম্প্রতিক কালে প্রেসের সামনে কথা বলতে গিয়ে। মনে হচ্ছে, কোন প্রেস আমার কথাগুলো কীভাবে নেবে। তারপর তারা কীভাবে ছাপবে। অথবা সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে এটা উপস্থাপন করবে। যারা আমরা রাজনীতি করি এটা আমাদের জন্য সত্যি একটা চিন্তার বিষয়। কারণ, সাম্প্রতিক কালে চরিত্র হরণ করার যে প্রবণতা বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখা দিয়েছে, এটাতে চিন্তিত না হয়ে উপায় নেই। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গত ৫৩-৫৪ বছরের মধ্যে বর্তমানে যে সরকার ক্ষমতায় আছে, এর মতো গণমাধ্যমের প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সরকার আসেনি। ভবিষ্যতে আসবে কি না, তা তিনি জানেন না।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি হস্তক্ষেপ কম ছিল, কিন্তু সামাজিক চাপ ছিল তীব্র। বিশেষ করে কিছু মিডিয়ার বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, যা বিশ্লেষণ করা দরকার। ফ্যাসিজমের প্রভাবে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মতো গণমাধ্যমেও দলীয়করণ হয়েছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ শুধু আইনি নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও হয়েছে। মিডিয়ার ভেতরে একধরনের ফ্যাসিবাদ ঢুকে গেছে, যা থেকে মুক্ত না হলে জনগণের আস্থা ফিরে আসবে না। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি মুক্ত গণমাধ্যমের প্রত্যাশা সবার। কিন্তু তার আগে গণমাধ্যম সংস্কারের রূপরেখা তৈরি ও বাস্তবায়ন জরুরি। এই সংস্কার দৃশ্যমান না হলে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন — এ দেশে অভ্যুত্থানের ওপর দাঁড়ানো সরকার তৈরি হয়েছে, কিন্তু মব আক্রমণ চলছে। এখন কোনো জায়গায় মব আক্রমণের হুমকি দিলে সেই জায়গায় কার্যকর হয়ে যাচ্ছে। ভয়ে কারও চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। সুতরাং এই মব আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্র যদি মব আক্রমণ বন্ধ করতে না পারে, তাহলে রাষ্ট্রেরই তো অস্তিত্ব থাকে না।


