জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, পৃথিবীতে প্রতি বছর যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হয় তা বৈশ্বিক জনসংখ্যার দেড় গুণকে খাওয়াতে সক্ষম। তবু বিশ্বের বহু মানুষ প্রয়োজনীয় খাবার পাচ্ছে না এবং কোটি কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার শিকার। এর প্রধান কারণ হলো অসম বণ্টন, দুর্বল অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষার অভাব, সংঘাত এবং খাদ্য অপচয়।
বাংলাদেশেও এই সমস্যা প্রবল। এফএওর গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ফার্ম থেকে প্রসেসিং পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে ধানের প্রায় ১৭ শতাংশ, কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণের অভাবের কারণে ১৪ শতাংশ ধান নষ্ট হয়। গমের ক্ষেত্রে ক্ষতির হার প্রায় ১৮ শতাংশ। ফল ও শাকসবজিতে ক্ষয়-ক্ষতির হার সর্বোচ্চ, যা বার্ষিক ভিত্তিতে ২৫–৪০ শতাংশ পর্যন্ত। আমের ক্ষেত্রে একক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩২ শতাংশ, মাছের ক্ষেত্রে ক্ষতি ২০–৩০ শতাংশ। পোলট্রি শিল্পেও ক্ষতি প্রায় ১৭ শতাংশ বলে এফএও কর্মকর্তা দিয়া সানু উল্লেখ করেছেন।
খাদ্য অপচয় শুধুমাত্র সরবরাহ চেইনে সমস্যা তৈরি করে না, জলবায়ু পরিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকেও তা গুরুত্বপূর্ণ। দিয়া সানু বলেন, খাদ্য ব্যবস্থায় অপচয় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের বড় কারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমানোর জন্য কৌশলগত নীতি, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, কোল্ড স্টোরেজ, বাজার ব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স ২০২৪ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৭৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৫ কোটি শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে বিকাশজনিত সমস্যায় ভুগছে। আর প্রতিদিন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খাদ্য অপচয় হচ্ছে। বাংলাদেশে গৃহস্থালি পর্যায়ে বছরে প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ টন খাবার অপচয় হয়, যেখানে প্রতিটি পরিবার গড়ে ৮২ কেজি খাবার নষ্ট করে। এ সময় দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, খাদ্য অপচয় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির পাশাপাশি পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ায়। তিনি নাগরিকদের সচেতনতা এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের ত্বরান্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত ‘খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি শূন্যের পথে: বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য মূল্য শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, শূন্য ক্ষতি ও অপচয় লক্ষ্য এখনও দূর, তবে অর্থবহ অগ্রগতি সম্ভব। কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন চলছে। এ বছর ১০০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ কার্যকর করা হয়েছে, আরও ১০০টি আসছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বাংলাদেশ ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর জেস উড বলেন, বৈশ্বিক খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ১.৩ বিলিয়ন টন প্রতি বছর নষ্ট হয়। বাংলাদেশের জন্য এই চ্যালেঞ্জ সমানভাবে গুরুতর, বিশেষত ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামানো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অংশ। তবে এ লক্ষ্য অর্জন করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টিজনিত সমস্যা আরও বৃহৎ আকার ধারণ করবে।


