হ্যালিউ (Hallyu) বা কোরিয়ান ওয়েভ ঝড়ের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে ও শুরু হয়েছিল কোরিয়ান টিভি ড্রামা দিয়ে, যেগুলো ৯০’র দশকের শেষ দিকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হওয়া শুরু করে কিন্তু ২০১২ সালে সাইর (Psy) গ্যাংনাম স্টাইল পশ্চিমের মাটিতে পা রাখার পরই কোরিয়ান সংস্কৃতির আসল ঢেউ শুরু হয়। আচমকাই সারা দুনিয়া ‘অদৃশ্য ঘোড়ার নাচ’ শিখতে শুরু করল, আর কে-পপ গান অ্যান্থেমে পরিণত হলো বিশ্বব্যাপী। এর পরবর্তী দশকে কোরিয়ান সাংস্কৃতিক রপ্তানি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যার মধ্যে ছিল বিটিএস-এর মতো কেপপ তারকারা, অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘প্যারাসাইট’ এবং বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘স্কুইড গেম’। যেন কোরিয়া আমাদের হাতে একটা প্লেলিস্ট ধরিয়ে দিয়ে বলছে, ‘নো চিন্তা, ডু ফুর্তি’! এই কোরিয়ান ঝড়ে লন্ডভন্ড হওয়া আমাদের সবার জীবনে এখন কে-পপ, কে-ড্রামা, কে-সিনেমা ছাড়াও যোগ হয়েছে কিমচি, বিবিমবাপ, কে-বিউটি। এবছর কোরিয়ান লেখক হান ক্যাং এর সাহিত্যে নোবেল পাবার পরে এখন যোগ হয়েছে কে-লিটারেচার।
২০২২ সালে, দক্ষিণ কোরিয়ার সাংস্কৃতিক রপ্তানির অর্থনৈতিক মূল্য ছিল ১৩.২ বিলিয়ন ডলার, যেটাকে ২০২৭ সালের মধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলারে পরিণত করতে চায় কোরিয়ান সরকার। তো কিভাবে কোরিয়া জিতে নিলো পুরো বিশ্ব? একটা কথা আছে, অস্থিরতা সৃষ্টিকে ত্বরান্বিত করেও দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসও অস্থির সময়ের ইতিহাস। ১৯৫০ এ দক্ষিণ কোরিয়া-উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাদের অর্থনৈতিক রূপান্তর পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়াকে পাড় হতে হয়েছে অনেক চড়াই উৎরাই আর সেটা তাদের সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতাকে প্রভাবিত করেছে। বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বং জুন-হো (Parasite) এবং পার্ক চান-উক (Old Boy) মনে করেন দেশের গতিশীল, অস্থির আর নাটকীয় অতীত তাদের শিখিয়েছে কিভাবে সিনেমায় গল্প বলা যায় ভিন্ন ভাবে। সাহিত্যে নোবেল জেতা হান ক্যাং-এর মতো দক্ষিণ কোরিয়ার লেখকরা, জাতির বেদনাদায়ক ইতিহাসের ভিতরকার কঠিন বিষয়গুলিকে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যিক শৈলীতে প্রকাশ করেছেন।হ্যালিউ বা কোরিয়ান ওয়েভ সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হওয়ার পিছনে অনেক কারণ আছে। যেমন, দক্ষিণ কোরিয়ার টিভি শো আর সিনেমার গল্প বলার স্টাইল পশ্চিম থেকে একেবারেই ভিন্ন।
কে-ড্রামা আর সিনেমা তাদের ভিন্ন ধরণের প্লট, ক্ষেত্র বিশেষে অতি নাটকীয়তা, আবেগের গভীরতা, ভিন্নধর্মী চরিত্র এবং রিলেটেবল বিষয়বস্তু দিয়ে সারা দুনিয়ার দর্শকদের মন জয় করেছে। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং নেটফ্লিক্সের মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলির উত্থানও আন্তর্জাতিক ফ্যানদের কাছে কোরিয়ান কন্টেন্ট সহজলভ্য করেছে। কে-পপ গানের আকর্ষণীয় সুর, দারুন কোরিওগ্রাফি এবং মিউজিক ভিডিও এক ভিন্ন ধরণের আনন্দ দিয়ে বিশ্বজুড়ে দর্শকের সাথে গড়ে তুলছে নিবিড় যোগ। দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ কম হলেও, সাহিত্যে তাদের অবদান অনস্বীকার্য ও তাদের অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি, অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম এবং সামাজিক সমস্যার বিষয় তুলে ধরার প্রচেষ্টা প্রশংসা পাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। হান কাং-এর বুকার পুরস্কারজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’, যা একজন নারীর মাংস খাওয়া বন্ধ করার গল্প নিয়ে রচিত, এটি ইকোফেমিনিজমের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে এটিকে ছাড়িয়ে যায় চো নাম-জু-এর লেখাবই ‘Kim Ji-young, Born 1982’, যে গল্পে একজন বিবাহিত দক্ষিণ কোরিয়ান নারী তার সন্তান পালনের জন্য চাকরি ছেড়ে দেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারও বর্তমান সময় তাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বড় বিনিয়োগ করেছে, হ্যালিউ প্রসারে যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু সরকার যে সবসময় সহায়তা করেছে তাও কিন্তু নয়। বং জুন-হো এবং হান ক্যাং-এর মতো শিল্পীরা অতীতে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে সরকারকর্তৃক ব্ল্যাকলিস্টেট হয়েছেন। তবুও, কিছু সরকারী উদ্যোগ যেমন Literature Translation Institute of Korea (LTI Korea) অনুবাদের মাধ্যমে কোরিয়ান সাহিত্যকে বৈশ্বিক দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে। তাছাড়া, Psy, BTS, Blankpink এর কেপপ তারকারাও কে-লিটেরাচারের আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা বাড়াতে বড় একটা ভূমিকা রেখেছে। কোরিয়ার এই সাফল্য হয়ত তাদের ওয়ার্ক হার্ড, প্লে হার্ড সামাজিক সংস্কৃতির সাথেও যুক্ত। বং জুন-হো তো মজা করে বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ানরা কাজ এবং আনন্দ দুই ক্ষেত্রেই চরমপন্থী ও তার মতে কোরিয়ানদের heavy drinking culture তাদের সৃজনশীলতাকে অনুপ্রাণিত করে। মোট কথা হলো, ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের সাথে আধুনিকতার সমন্বয় কোরিয়ান কনটেন্টকে সতেজ এবং উদ্ভাবনী করে তুলেছে, যা বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক রুচির মানুষের কাছেও বেশ গ্রহণযোগ্য।


