ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ায় তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। দেশটির বহু পুরুষ নিহত বা সামরিক কাজে ব্যস্ত থাকায় নির্মাণ, আইটি ও পোশাক খাতগুলোতে স্থানীয় শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সংকট মোকাবেলায় উত্তর কোরিয়ার হাজার হাজার নাগরিককে রাশিয়ায় কাজ করতে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি । তবে তাদের কাজের পরিবেশকে দাসপ্রথার মতো উল্লেখ করেছেন পালিয়ে আসা শ্রমিকরা।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন নির্মাণস্থলে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদেরকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা হয়। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কাজের স্থলে নিয়ে আসা হয় এবং তাদেরকে কাজের স্থান বা পরিবেশ সম্পর্কে কাউকে কিছু বলার অনুমতি দেওয়া হয় না। শ্রমিকদের কাজের সময়সূচি অত্যন্ত কঠোর: ভোর ৬টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয়। বছরে ছুটি মাত্র দুই দিন। শ্রমিকদের ক্লান্তি ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেকেই কাজের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তেন বা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। তবে সুপারভাইজাররা তাদেরকে শারীরিকভাবে শাস্তি দিত। এমন কঠোর পরিবেশে শ্রমিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। দক্ষিণ কোরিয়ার দোং-আ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাং দং-ওয়ান উল্লেখ করেছেন, শ্রমিকরা অন্ধকারে সীমিত সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে কাজ করেন এবং নিরাপত্তার জন্য রাতে আলো বন্ধ রাখা হয়।
পালিয়ে আসা শ্রমিকরা জানান, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের নজরদারিতে দিন-রাত নির্মাণস্থলে আটকে থাকতে হয়। তারা নোংরা শিপিং কনটেইনারে ঘুমোতে বাধ্য হন, যেখানে প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে শীত নিবারণের জন্য মাত্র ত্রিপল ব্যবহার করা হয়।
জাতিসংঘ ২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিক বিদেশে পাঠানো নিয়ন্ত্রণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে রাশিয়ার তীব্র চাহিদা ও জাতিসংঘের নজর এড়াতে, উত্তর কোরিয়ার সরকার সীমিত আয়ের বড় অংশ রাষ্ট্রের হাতে দেয়। শ্রমিকরা হাতে মাত্র ১০০-২০০ ডলার পেয়েছেন এবং দেশে ফেরার আগে এই পারিশ্রমিকও পান না।
পালানো শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, দেশটিতে ফিরতে চাওয়া শ্রমিকদের প্রতি নিয়মিত দমননীতি আরোপ করা হয়েছে। কিম জং উনের প্রতি আনুগত্য নিশ্চিত করতে তাদের বাধ্যতামূলক কর্মশালায় অংশ নিতে হয়। আগে মাসে একবার দলের সঙ্গে ছুটি কাটানোর সুযোগ থাকলেও বর্তমানে তা সীমিত করা হয়েছে।
গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার শ্রমিক সংকটের এই পরিস্থিতিতে উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের ব্যবহার একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল।তারা সস্তা, কঠোর পরিশ্রমী এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সের্গেই শোইগু প্রকাশ করেছেন যে, উত্তর কোরিয়ার শ্রমিকদের ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের পুনর্নির্মাণ প্রকল্পেও পাঠানো হবে।
পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই শ্রমিকরা ভয়াবহ, বিপজ্জনক এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ করছেন। এটি কেবল রাশিয়ার শ্রমিক সংকট মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না, বরং উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়ানোর একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে।


