বাংলাদেশে প্রতি দুইজন নারীর মধ্যে একজন স্বামীর সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সদ্য প্রকাশিত ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ–২০২৪’-এ উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামীর সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন—যার মধ্যে শারীরিক, যৌন, মানসিক, অর্থনৈতিক সহিংসতা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ অন্তর্ভুক্ত। শুধু গত এক বছরে ৪৯ শতাংশ নারী এমন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সোমবার (১৩ অক্টোবর) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বিবিএস। ‘জিওস্পেশিয়াল ইনফরমেশন ইন্টিগ্রেটিং উইথ জেন্ডার অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রকল্পের পরিচালক মীনাক্ষী বিশ্বাস অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, ১৫ বছর বয়স থেকে এখন পর্যন্ত ১৫ শতাংশ নারী স্বামী ছাড়া অন্য ব্যক্তির হাতে শারীরিক সহিংসতা ও ২ দশমিক ২ শতাংশ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে কিছুটা অগ্রগতি হলেও ২০১৫ সালে স্বামী কর্তৃক সহিংসতার হার ছিল ৬৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯ শতাংশে। তবে সহিংসতা প্রতিরোধে চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা পাওয়ার ব্যয় এবং সামাজিক বাধা এখনো বড় প্রতিবন্ধক হয়ে আছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, বাংলাদেশের ৫৪ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় স্বামীর দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ৬০ শতাংশ গত এক বছরে একাধিকবার সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। গর্ভাবস্থাতেও নারীরা নিরাপদ নন—বিবাহিত নারীদের মধ্যে ৭ দশমিক ২ শতাংশ শারীরিক ও ৫ দশমিক ৩ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
নন-পার্টনার সহিংসতার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে প্রধানত শাশুড়ি ও পুরুষ আত্মীয়রা জড়িত। যৌন সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে পরিচিত পুরুষদের মাধ্যমে—যেমন আত্মীয়, বন্ধু বা প্রতিবেশী। প্রযুক্তি-সহায়ক সহিংসতাও দ্রুত বাড়ছে। জরিপে দেখা যায়, ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী ডিজিটাল মাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে ছবি অপব্যবহার, যৌন ব্ল্যাকমেইল ও অনলাইন নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, তিনজনের মধ্যে দুইজন ভুক্তভোগী কখনোই সহিংসতার কথা প্রকাশ করেননি বা সাহায্য চাননি। মাত্র ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ নারী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। নন-পার্টনার সহিংসতার ক্ষেত্রে এই হার আরও কম, মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
এছাড়া ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ নারী জানেন না কোথায় অভিযোগ জানাতে হয়। মাত্র ১২ দশমিক ৩ শতাংশ নারী সহিংসতা প্রতিরোধ হেল্পলাইন ‘১০৯’ সম্পর্কে অবগত।
বিবিএস জানায়, কম বয়সে বিয়ে, যৌতুক প্রথা, স্বামীর মাদকাসক্তি বা পরকীয়া এবং শহরের বস্তিতে বসবাস নারীর সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে স্বামীর উচ্চতর শিক্ষা সহিংসতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। নন-পার্টনার সহিংসতার ক্ষেত্রে নারীর কম বয়স, সীমিত শিক্ষা ও প্রতিবন্ধিতা বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।


