বাংলাদেশে নারীরা গৃহস্থালির কাজ এবং বিভিন্ন ধরনের সেবাযত্নের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এ পর্যন্ত এই শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য মূলধারার হিসাব থেকে বাদ পড়ে আসছিল। রান্না, ঘর গোছানো, কাপড় ধোয়া, শিশু ও বৃদ্ধের যত্ন, অসুস্থের সেবা এসব কার্যকলাপের ওপর পরিবার ও সমাজ নির্ভরশীল। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত দেশের জাতীয় অর্থনীতির হিসাবপত্রে এই কাজগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এই অদৃশ্য শ্রমের আর্থিক গুরুত্ব উদঘাটন করেছে।
বিবিএসের হাউসহোল্ড প্রডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (এইচপিএসএ) ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যদি বাংলাদেশের নারীরা গৃহস্থালি এবং সেবাযত্নের কাজে মজুরি পেতেন, তাহলে এর আর্থিক মূল্য ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন টাকা বা ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা হতো। এর মধ্যে গৃহস্থালির কাজের বিনা মজুরির আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সেবাযত্নের কাজে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। নারীর পাশাপাশি পুরুষদের বিনা মজুরির কাজকে যুক্ত করলে মোট আর্থিক মূল্য বছরে ৬ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন টাকা বা ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা হিসেবে অনুমান করা হয়েছে।
এই তথ্য থেকে স্পষ্ট নারীর শ্রম শুধুমাত্র পারিবারিক বা সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির একটি অদৃশ্য কিন্তু বড় অংশের সঙ্গে জড়িত। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের সঙ্গে তুলনা করলে, এই পরিমাণ অর্থ নারীর অবদানকে দৃশ্যমান করার পাশাপাশি নীতি নির্ধারণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। নারীর বিনা মজুরির শ্রমকে যদি অর্থনৈতিক হিসাবের আওতায় আনা হয়, তবে অর্থনীতির প্রকৃত ছবি এবং সামাজিক উন্নয়নের মূল্যায়ন আরও যথাযথভাবে করা সম্ভব হবে।
বিবিএসের হাউসহোল্ড প্রডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন দীর্ঘদিন ধরে নারীর শ্রম অর্থনীতির ছায়ায় ছিল এবং এই প্রতিবেদন সেই অমূল্য অবদানকে দৃশ্যমান করেছে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মমতাজ আহমেদ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার এবং ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিংহ। অনুষ্ঠান সভাপতিত্ব করেন বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। প্রতিবেদনের উপস্থাপন করেন বিবিএসের উপপরিচালক আসমা আখতার।
অতীতের অর্থনৈতিক হিসাবপত্রে নারীর বিনা মজুরির শ্রমকে অন্তর্ভুক্ত না করার ফলে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র প্রায়শই অসম্পূর্ণ দেখানো হতো। বিবিএসের এই গবেষণা এবং প্রতিবেদনের মাধ্যমে নারীর এই শ্রমের আর্থিক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ স্থাপন করেছে। এটি নীতি নির্ধারক এবং সমাজকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, যাতে নারীর অবদানকে কেবল সামাজিক বা পারিবারিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক এবং নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
নারীর বিনা মজুরির শ্রম কেবল পরিবারের কার্যকরী রক্ষণাবেক্ষণ নয়, এটি দেশের অর্থনীতির একটি মৌলিক ভিত্তি। বিবিএসের এই গবেষণা দেশীয় নীতি নির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানের জন্য একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রবর্তন করেছে, যা নারীর শ্রমকে অর্থনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


