বিপ্লবের ডাক ও লেনিনের সমালোচনায় মায়াকোভস্কির কবিতা ‘১৫০ মিলিয়ন’

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির “150,000,000” (রুশ: Sto pyat’desyat millionov) কবিতাটি ১৯১৯ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে রচিত একটি বিপ্লবী কবিতা, যা ১৯২১ সালে প্রকাশিত হয়। এটি রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে তৈরি এবং রুশ জনগণের বিপ্লবী চেতনা তুলে ধরার উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা হয়েছিল।মায়াকোভস্কি তার কবিতার মাধ্যমে শুধু সমাজ পরিবর্তনের ডাক দেননি, তিনি তার সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে এই কবিতার সাহিত্যিক মূল্যায়ন এবং এর প্রভাব নিয়ে নানা সমালোচনা ও বিতর্কও হয়েছে।

“150,000,000” কবিতাটি মায়াকোভস্কি ১৯১৯ সালের প্রথমার্ধে শুরু করেন, এবং ১৯২০ সালের মার্চ মাসে সম্পন্ন করেন। কবিতার কাজের শিরোনামগুলো ছিল ভিন্ন ভিন্ন: “The Will of the Millions” (ভলিয়া মিলিয়নোভ), “The Tale of Ivan” (বিলিনা অব ইভানে), এবং “Ivan The Bylina. The Revolutionary Epic” (ইভান বিলিনা। ইপোস রেভোলিউটসিয়ি)। ১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে এটি গসিজদাত (Gosizdat) প্রকাশনী থেকে ছাপা হয়, যদিও প্রথম সংস্করণে লেখকের নাম ছিল না। এতে কবিতার প্রথম দুটি স্তবকে স্পষ্ট করে বলা হয়: “150 মিলিয়ন হল এই কবিতার মালিকের নাম / বুলেট হল ছন্দ, আগুনের রাইম বাড়ি বাড়ি ঝাঁপিয়ে পড়ছে। / 150 মিলিয়ন আমার মুখ দিয়ে কথা বলে / জনতা কাগজের উপর পদক্ষেপের পাথর হয়ে চলেছে।” এই অংশ থেকে বোঝা যায়, কবিতার মালিকানা কোনো এক ব্যক্তির নয়, বরং ১৫০ মিলিয়ন মানুষের, অর্থাৎ গোটা জনগণের।

এই কবিতায় মায়াকোভস্কি রুশ জনগণের বিপ্লবী শক্তিকে প্রতিফলিত করার জন্য “ইভান” নামে একটি কাল্পনিক চরিত্র ব্যবহার করেছেন, যা মূলত সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব। কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই “ইভান” এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের মধ্যে সংঘটিত প্রতীকী যুদ্ধ।উইলসন এখানে পুঁজিবাদের প্রতীক এবং শোষক শক্তির রূপে উপস্থাপিত হয়। মায়াকোভস্কি কবিতার মাধ্যমে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে “ইভান” রুশ বিপ্লবের সংগ্রামী মানুষের প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। এই যুদ্ধের চিত্রায়ন কেবলমাত্র রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত নয়; এটি একটি আদর্শিক যুদ্ধ, যেখানে শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন সমাজ গঠনের ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়। কবিতার ভাষা অত্যন্ত তীব্র, শক্তিশালী এবং রোমাঞ্চকর, যা বিপ্লবের উত্তেজনা এবং মানুষের উদ্দীপনা প্রকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কবিতার শৈলী এবং ছন্দ-তাল মায়াকোভস্কির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রূপক এবং আগ্রাসী ভাষার মাধ্যমে বিপ্লবের আবেগ ও উত্তেজনাকে জীবন্ত করে তোলে।

সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে “150,000,000” কবিতাটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। বিপ্লবী চেতনার শক্তিশালী প্রকাশ হিসেবে একাংশ সমালোচক কবিতাটির প্রশংসা করেছেন, যেখানে ভাষার তীব্রতা এবং রূপকের গভীরতা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। কবিতাটি রুশ সাহিত্যে একটি নতুন ধারার সূচনা করেছে, যেখানে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার সঙ্গে আধুনিক কবিতার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। অন্যদিকে সোভিয়েত বিপ্লবী নেতা ভ্লাদিমির লেনিন কবিতাটিকে “অহংকারী এবং সন্দেহজনক” বলে অভিহিত করেছিলেন। লেনিনের মতে, কবিতায় বিপ্লবের বাস্তব সংগ্রামের প্রকৃত চিত্র এবং সাধারণ মানুষের সংগ্রামের গভীরতা প্রতিফলিত হয়নি। তার দৃষ্টিতে কবিতার ভাষা ও ভাব প্রকাশ কখনো কখনো অতিরঞ্জিত এবং ব্যক্তিগত অহংকার দ্বারা প্রভাবিত ছিল, যা বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত। এই সমালোচনা থেকে বোঝা যায়, সাহিত্যিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সে সময়ের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে কবিতাটির গ্রহণযোগ্যতা ছিল সীমিত।

বর্তমান সময়ে, যখন বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আন্দোলন লক্ষ্য করা যায়, “150,000,000” কবিতার প্রতীকী অর্থ নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কবিতায় উল্লিখিত “ইভান” এবং “উইলসন” চরিত্রগুলো আধুনিক সমাজে ক্ষমতা, শোষণ ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও দেখা যেতে পারে। মায়াকোভস্কির এই বিপ্লবী চেতনা আজকের সময়েও জনসাধারণের মধ্যে সমতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

বিশেষ করে আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই কবিতার ভাবনা এবং ভাষা নতুন প্রজন্মের মধ্যে আন্দোলনের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। বিপ্লবী ভাষা এবং সংগ্রামের কথা বলা কবিতাটি, যদিও এক সময় সীমিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেখা, তার মৌলিক চেতনা আজও অর্থপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক।

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির “150,000,000” কবিতা কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়; এটি একটি সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের আয়না ।কবিতাটি বিপ্লবী চেতনার প্রতীক হিসেবে উচ্চকিত হলেও, সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কিছু সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে। তার ভাষা ও রূপক চিত্র বিপ্লবের উত্তেজনা এবং মানুষের সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটিয়েছে, যা আধুনিক সমাজেও প্রাসঙ্গিক।

এই কবিতার মাধ্যমে মায়াকোভস্কি যে বিপ্লবী চেতনা এবং জনগণের সংগ্রামের আহ্বান জানিয়েছেন, তা ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজকের বিশ্বে যেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি জোরালো, সেখানে “150,000,000” কবিতার বার্তা ও ভাষা নতুন প্রজন্মের মধ্যে আন্দোলন ও পরিবর্তনের চেতনা উদ্রেক করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন