২০০৯ সালের পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহের প্রায় দেড় দশক পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বতী সরকার জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। কমিশনের লক্ষ্য পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং জড়িতদের চিহ্নিত করা।বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা সহ ৭৪ জন নিহত হন। এর পরপরই হত্যা ও বিস্ফোরণ আইনে মামলা করা হয়, যার রায়ে ১৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু শুরু থেকেই বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও তাদের নাম তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
গত বছরের ২৪শে ডিসেম্বর কমিশন গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ৬০ দিন পেরিয়ে গেছে এবং কমিশন বলছে যে তাদের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে। কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আল ম ফজলুর রহমান জানিয়েছেন যে, সেনা ও বিডিআর কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শী ও তৎকালীন দায়িত্বশীল সেনা কর্মকর্তাদের অন্তত ৩৭ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বেঁচে নেই, পাশাপাশি আলামতও অনেকাংশে নষ্ট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় প্রকৃত সত্য কতটুকু উদঘাটন সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে কমিশন বলছে, তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে এবং যাদের প্রয়োজন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার কমিশনের কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও, দণ্ডপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্যরা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, কমিশন এখন পর্যন্ত তাদের কারও সঙ্গে কথা বলেনি, যা তদন্তের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। বিদ্রোহের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও বিদেশি সংস্থার হাত থাকার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনরা দাবি করছেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক নেতা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং তাদের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কমিশন বলছে, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যগ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
কমিশন তদন্তের স্বার্থে কিছু ব্যক্তির বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়েছে, তবে তাদের নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তারা আশ্বাস দিয়েছেন যে, প্রয়োজন হলে সাজাপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলা হবে। দীর্ঘদিন পর হলেও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত নিহতদের স্বজনদের জন্য আশার সঞ্চার করেছে। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত বিডিআর সদস্যদের বক্তব্য শোনা না হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাবে। কমিশন তাদের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবে কি না এবং সত্যিই প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।


