আইজ্যাক নিউটন, কার্ল লিনিয়াস, রবার্ট বয়েল প্রমূখদের আজ আমরা বিজ্ঞানের পিতা হিসেবে জানি তাঁরা এক সময় ছিলেন জাদুবিদ্যা ও অলৌকিকতার অন্ধ অনুসারী। এমনকি আমাদের যুক্তিবাদী চোখে আজ যেসব বিশ্বাস হাস্যকর ঠেকে, মারমেইড খোঁজা, অস্ত্রের ক্ষত নিরাময়ে “weapon salve” ব্যবহার কিংবা মৃতদেহের রক্তপাত দিয়ে খুনির শনাক্তকরণ সেসব ছিল এক সময় প্রকৃত অনুসন্ধিৎসুর কাজ। এইসব অদ্ভুত বিশ্বাসের ভিতর দিয়েই গড়ে উঠেছিল আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি।
১৯৩৬ সালে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস নিউটনের কিছু অপ্রকাশিত নোট কেনেন। তাতে ছিলো ১ লাখেরও বেশি শব্দে লেখা নিউটনের গোপন এলকেমিক গবেষণা। কেইনস হতবাক হয়ে বলেছিলেন, “এগুলো পুরোপুরি যাদুবিদ্যাচর্চা বিজ্ঞানের কোনো মানদণ্ডে পড়ে না।” আর এই অভিজ্ঞতার পরেই কেইনস মন্তব্য করেন, “নিউটন কেবল যুগান্তরের বিজ্ঞানী ছিলো না সে ছিলো শেষ যাদুকর।” কিন্তু শুধু নিউটনই নন, বিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল, কার্ল লিনিয়াস, এমনকি জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহেও ছিলেন অদ্ভুত বিশ্বাসের অনুসারী। এক সময়ের ইউরোপ ছিলো এক অভূতপূর্ব জগত, যেখানে বিজ্ঞান ও যাদুবিদ্যা হাত ধরাধরি করে চলত।
মধ্যযুগে ইউরোপীয় শিক্ষাব্যবস্থা ছিলো পুরাতন গ্রিক ও আরব লেখকদের অনুবাদনির্ভর। জ্ঞান মানে ছিলো শুধু তাদের মতানুযায়ী চলা। ১৪শ শতকের অক্সফোর্ডে কেউ যদি অ্যারিস্টটলের বিরুদ্ধে কিছু বলতো, তাকে ৫ শিলিং জরিমানা গুনতে হতো। কৌতূহলকে মনে করা হতো পাপ। এই বন্ধ গণ্ডি থেকে মুক্তি এনে দিয়েছিলো যাদুবিদ্যা, অন্তত সেটাই ছিলো তখনকার অনেক বিজ্ঞানীর কাছে বাস্তবতর ও অধিক সম্ভাবনাময়।
১৬শ শতাব্দীর সুইস-জার্মান চিকিৎসক প্যারাসেলসাস ছিলেন প্রথমদের মধ্যে যিনি পরীক্ষালব্ধ জ্ঞানের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি পুরাতন গ্রন্থ পুড়িয়ে জনসমক্ষে ঘোষণা করেন প্রকৃত জ্ঞান বইয়ে নয়, প্রকৃতিতে। প্যারাসেলসাস মনে করতেন, চিকিৎসা, রসায়ন ও জ্যোতিষ বিদ্যা সবই ঈশ্বরীয় রহস্য উন্মোচনের পথ। তাঁর এই যাদু-প্রেমভরা বৈজ্ঞানিক মনোভাব পরবর্তী বহু শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করে।
ডেনিশ জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে একটি দ্বন্দ্বে নাক হারানোর পর প্যারাসেলসাসের চিকিৎসাবিদ্যা ও জ্যোতিষের প্রতি আকৃষ্ট হন। তখনকার দিনে তারা তারার অবস্থান দেখতো বই দেখে, কিন্তু ব্রাহে আকাশের দিকে সরাসরি তাকিয়েই এক বিশাল তারকাতালিকা তৈরি করেন। তিনি আবিষ্কার করেন সুপারনোভা ও ধূমকেতু এবং বিশ্বাস করতেন এসব মহাজাগতিক ঘটনা দুর্ভাগ্য ও রাজ্যপতনের পূর্বাভাস। তিনি ১৫৭২ সালে একটি নতুন তারা দেখে ডেনমার্কের রাজাকে গোপনে সতর্ক করে বলেন, “সব সৃষ্টির চিরন্তন বিশ্রামের সময় ঘনিয়ে এসেছে।”
কার্ল লিনিয়াস, যিনি আজ ‘জীববিজ্ঞানের জনক’ হিসেবে পরিচিত তিনিও মারমেইড খুঁজতে রাজপর্ষদকে অনুরোধ করেছিলেন। বিজ্ঞান ও অলৌকিকতাকে আলাদা করার চিন্তা তখনও স্পষ্ট ছিল না। তার জন্যই হয়তো আজ আমাদের কাছে হাস্যকর মনে হলেও, তাঁদের জন্য তা ছিলো এক ধরণের অনুসন্ধানী বোধ।
বিজ্ঞানীরা তখন গবেষণার তহবিল পেতেন রাজা, সম্রাট কিংবা অভিজাতদের কাছ থেকে আর তারাও চাইতেন দৃষ্টিনন্দন ‘ফলাফল’: স্বর্ণ বানানো, অমরত্বের ওষুধ, কিংবা আগামীকাল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী। রোমান সম্রাট রুডলফ দ্বিতীয় ছিলেন সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক। তাঁর প্রাগ প্রাসাদ ছিলো বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান-যাদুবিদ্যা কেন্দ্র। তিনি নিজের হাতে এলকেমির কাজ করতেন, সঙ্গে থাকতেন ব্রাহে ও কেপলারের মতো জ্যোতির্বিদ।
তখনকার এলকেমি থেকে উন্নত হয় খনিজবিদ্যা, গ্লাস ও সিরামিক প্রযুক্তি, ফার্নেস ডিজাইন। জ্যোতিষচর্চা থেকে তৈরি হয় ঘড়ি, লেন্স, টেলিস্কোপ, সেকস্ট্যান্ট। এমনকি ১৭৪৯ সালেও কার্ল লিনিয়াস মারমেইড খুঁজতে সুইডিশ বিজ্ঞান একাডেমিকে চাপ দেন। নিউটন নিজেই বাকি জীবন কাটান বাইবেলের গোপন সংকেত খুঁজে, এলকেমির পরীক্ষা করে। স্যার কেনেল্ম ডিগবি ‘weapon salve’ নিয়ে চিকিৎসা করেন, রবার্ট বয়েল “দ্বিতীয় দৃষ্টিশক্তি” গবেষণা করেন, রেনে ডেকার্তেস মৃতদেহের রক্তপাত নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে ফিরেন।
আজ আমরা জানি মারমেইড, জ্যোতিষ, এলকেমি এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু একে অস্বীকার করলেই ইতিহাস ভুলবো। কারণ এইসব বিশ্বাস যতই ‘অদ্ভুত’ হোক একসময় ছিলো সাহসিকতা ও কৌতূহলের জন্মদাত্রী।


