সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একটি অভিনব গবেষণা করে গাছকে তার প্রতিবেশী গাছের সঙ্গে ‘আলাপ’ করতে দেখেছেন। এই গবেষণাটি গাছের মধ্যকার যোগাযোগের নতুন একটি দিক উন্মোচন করেছে, যা বিজ্ঞানীদের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। আমাদের কাছে গাছেরা সাধারণত নিষ্ক্রিয় নীরব বস্তু হিসেবে পরিচিত হলেও, এই নতুন গবেষণা প্রমাণ করেছে যে গাছেরা প্রকৃতপক্ষে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং এমনকি একে অপরকে বিভিন্ন সংকেত পাঠায়। কিন্তু প্রশ্ন হল গাছেরা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তারা কীভাবে নিজেদের চাহিদা বা বিপদের সংকেত একে অপরকে জানায়? গবেষণাটি একদম নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে যেখানে বিজ্ঞানীরা গাছের মধ্যে শারীরিক বা রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। এটি প্রথমে অবিশ্বাস্য হলেও বড় বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাছের ‘আলাপ’ কীভাবে সম্ভব?
গাছেরা একে অপরকে কীভাবে সংকেত পাঠায়, তা আমাদের কাছে প্রাথমিকভাবে অজ্ঞাত ছিল। তবে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, গাছেরা মূলত রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে। এই সংকেতগুলির মধ্যে প্রধানত ‘ভেগিটেটিভসিগন্যালস’ বা উদ্ভিদজগতের সংকেতসমূহ থাকে, যা গাছেরা উন্মুক্ত পরিবেশে বাতাসে অথবা মাটির মাধ্যমে পাঠিয়ে থাকে। গাছের শিকড় এবং পাতা নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত করে, যা প্রতিবেশী গাছের কাছে পৌঁছায় এবং সেখানে গাছটি প্রতিক্রিয়া জানায়। এ ধরনের যোগাযোগের মধ্যে অনেক সময় আক্রমণকারীর উপস্থিতি জানানো, জল এবং পুষ্টির অভাব অনুভব করা, বা আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কিত সংকেত থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছেরা এর মাধ্যমে নিজেদের সংকটগুলি শেয়ার করে এবং নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করে।উদাহরণস্বরূপ, একটি গাছ যদি তার শিকড়ে কোনও হুমকি অনুভব করে, যেমন পোকামাকড় বা রোগের আক্রমণ, তবে এটি রাসায়নিক সংকেত নিঃসৃত করতে পারে, যা আশেপাশের গাছগুলিকে সতর্ক করে। এর ফলে আশেপাশের গাছগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রস্তুত করে রাখতে পারে। গবেষণায় অংশ নেওয়া বিজ্ঞানীরা গাছের পাতা এবং শিকড়ে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর ব্যবহার করে, এগুলো গাছের মধ্যে চলাচল করা রাসায়নিক পদার্থ এবং সংকেতগুলির গতিপথ ট্র্যাক করে। এর মাধ্যমে তারা দেখেছেন, গাছেরা একে অপরের সঙ্গে ‘আলাপ’ করতে সক্ষম। একে অন্যকে সংকেত পাঠানো এবং প্রাপ্ত সংকেত অনুযায়ী বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানানো গাছের আচার-আচরণকে বুঝতে সাহায্য করেছে।
গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, একটি গাছ যখন আশেপাশের গাছের কাছ থেকে সংকেত গ্রহণ করে, তখন তা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। যেমন, গাছেরা যখন রোগ বা পোকামাকড়ের আক্রমণ সম্পর্কে জানে, তখন তারা নিজেদের পাতার মধ্যে তেল এবং প্রোটিন জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত করে, এটি আক্রমণকারী প্রাণীকে দূরে রাখতে সহায়তা করে। এটি গাছের আত্মরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রতিবেশীদের সাহায্যের ক্ষেত্রে একটি চমৎকার উদাহরণ।
এই গবেষণাটি ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন গাছের এই যোগাযোগের রহস্য আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে চাইছেন। কীভাবে গাছেরা সংকেত পাঠায় সে সম্পর্কে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি উদ্ভিদের এই ‘আলাপ’ আমাদের খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য কীভাবে কার্যকর হতে পারে, তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ।উদ্ভিদজগতের এই নতুন যোগাযোগের ধারাটি আমাদের পরিবেশগত সমস্যা এবং খাদ্য নিরাপত্তার দিকে আরও মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করছে। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের গবেষণার মাধ্যমে আমরা উদ্ভিদের মধ্যে আরও ব্যাপক যোগাযোগের পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারি, যা কৃষি এবং পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


