ভূতের গল্প, অদৃশ্য স্পন্দন, ছায়ামূর্তি এসবের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। আধুনিক টেলিভিশন ও ইউটিউবের কল্যাণে আজ ভূত শিকার বা ‘ঘোস্ট হান্টিং’ এক বিশেষ বিনোদনে পরিণত হয়েছে। অথচ এই রহস্যময়তার আড়ালেই অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ঠকানোর নিখুঁত কলাকৌশল।
ডেরেক অ্যাকোরা
ডেরেক অ্যাকোরা ছিলেন ব্রিটিশ টেলিভিশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিডিয়ামদের একজন। তিনি দাবি করতেন মৃত আত্মাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন। কিন্তু ২০০৫ সালে Most Haunted শো-এর নির্মাতারা স্বয়ং এক ‘ফাঁদ’ পেতে দেন ডেরেকের জন্য।তারা ভুয়া আত্মার নাম-‘ক্রেডিওন’ এবং ‘রিখারভ’-তাঁর কাছে নানা ছলে পৌঁছে দেন। ডেরেক পরবর্তী এপিসোডে সেই ভুয়া আত্মাদের সঙ্গেই ‘যোগাযোগ’ করেন। এটি ছিল এক ভয়ঙ্কর প্রমাণ-তিনি সত্যিই কিছু দেখতে পাচ্ছেন না, বরং যা শোনেন সেটাকেই নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেন। শো-এর সহ-নির্মাতা ইয়েভেট ফিল্ডিং পরে বলেন, ‘আমরা বুঝেছিলাম সে নিজেই আমাদের দর্শকদের ঠকাচ্ছে।’
এড ও লরেইন ওয়ারেন
ওয়ারেন দম্পতি আধুনিক প্যারানরমাল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত নাম। তারা দাবি করতেন, শতাধিক ‘হান্টেড’ কেসে তারা কাজ করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত কেস-The Amityville Horror-আজ প্রমাণিত যে একটি ‘হরর হোয়াক্স’। ১৯৭৫ সালে জর্জ ও ক্যাথি লুটজ নামে এক দম্পতি দাবি করেন, তাঁদের বাড়ি ভয়ংকর আত্মায় পূর্ণ। ওয়ারেন দম্পতি কেসটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলেন। পরে একাধিক তদন্তে প্রমাণিত হয়, লুটজ পরিবারের গল্প অনেকাংশেই বানানো ছিল। এমনকি তাদের আইনজীবী স্বীকার করেন, এই গল্প মূলত একটি ‘উপন্যাসের’ প্লট হিসেবেই তৈরি করা হয়েছিল। ওয়ারেন দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগ-তারা মানুষের শোক, ভয় এবং বিশ্বাসকে পুঁজি করে বানিয়েছেন একটি লাভজনক দানবিক ব্র্যান্ড।
গ্রান্ট উইলসন ও জেসন হাওয়েস
২০০৪ সাল থেকে প্রচারিত হওয়া Ghost Hunters শো দর্শকদের মধ্যে একধরনের বিজ্ঞানভিত্তিক ভূত শিকারীর ধারণা তৈরি করেছিল। টেকনিক্যাল যন্ত্র, থার্মাল ক্যামেরা, EVP রেকর্ডিং, সব ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে এক পর্বে দেখা যায়, গ্রান্ট উইলসনের জ্যাকেটের ভেতর থেকে রহস্যময়ভাবে দড়ি বা সুতা বেরিয়ে আসছে-যা দেখে দর্শকদের মনে প্রশ্ন ওঠে, এ কি স্ক্রিপ্টেড? পরে অনেক সমালোচক ও ইউটিউব বিশ্লেষক দাবি করেন, বেশ কিছু ‘ঘটনা’ পূর্ব-পরিকল্পিত এবং ক্যামেরার জন্যই করা হয়েছে। অবশ্য TAPS কখনও সরাসরি প্রতারণা স্বীকার করেনি। তবে তারা নিজেদের ‘entertainment-based investigation’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা শুরু করে, যা নিজেই একরকম স্বীকারোক্তি।
ব্র্যাড ও ব্যারি ক্লিঞ্জ
Discovery Channel-এর Ghost Lab ছিল অপেক্ষাকৃত স্বল্পস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত নাটকীয় একটি শো। দুই ভাই ব্র্যাড ও ব্যারি ক্লিঞ্জ দাবি করতেন তারা ‘সায়েন্টিফিক অ্যাপ্রোচ’ ব্যবহার করে আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করছেন। তবে শোটি নিয়েই সমস্যা। তারা যেসব ডিভাইস ব্যবহার করতেন তা নিয়ে পরবর্তীতে প্যারানরমাল গবেষকদের অনেকেই বলেন, ‘তারা বুঝতেই পারতেন না ডিভাইসটি কী করছে।’ বলা চলে বিজ্ঞানকে ভান হিসেবে ব্যবহার করে তারা দর্শকদের ভীতি ও উত্তেজনায় মাতিয়ে তুলেছিলেন। এমনকি অনেক ঘটনা যা ‘লাইভ রেকর্ডেড’ দাবি করা হয়েছিল, ছিল পূর্ব-ধার্য নাট্যরূপ।
জ্যাক ব্যাগান্স
জ্যাক ব্যাগান্স সম্ভবত একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে পপুলার ঘোস্ট হান্টার। তাঁর ক্যারিশম্যাটিক ভয় পাওয়ার ধরন এবং বারবার ভূতের ওপর ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুঁড়ে দেওয়ার ঢঙ অনেকের কাছে হাস্যকরও বটে। সমালোচকদের মতে, Ghost Adventures এর অনেক দৃশ্য চিত্রনাট্যভিত্তিক। এমনকি কিছু সাবেক টিম মেম্বার দাবি করেছেন, ‘অনেক সময় আমাদের বলা হতো কোথায় কী প্রতিক্রিয়া দিতে হবে।’ তাঁর ব্যক্তিগত ‘Haunted Museum’-এ থাকা বহু বস্তু নিয়েও রয়েছে সন্দেহ। সত্যিই কি সেই সব পুতুল বা দোলনা চেয়ারে আত্মা আছে, নাকি এগুলো কেবল ব্র্যান্ডেড হরর?
ভূত-শিকার আজকের দিনে কেবল কল্পনা নয়, একটি ব্যবসা। কেউ তা করেন বাস্তব বিশ্বাস থেকে, কেউ বা নিছক বিনোদনের জন্য। তবে এই পাঁচজন গোস্ট হান্টার আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন-কিভাবে ভয়ের বাজারে প্রতারণা বিক্রি হয় বিশ্বাসের মোড়কে। আমরা হয়তো কখনও জানতে পারব না আত্মা আছে কিনা, কিন্তু আমরা জানি-আছে ক্যামেরা, আছে গল্প, আর আছে মানুষ ঠকানোর এক সুপরিকল্পিত থিয়েটার।


