বিএনপি কেন চুপ নিজেদের হাতে নেতাকর্মী খুনে : মনোজ দে , প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

“… রাজনৈতিক চর্চায় বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার যে গোত্রবাদী চর্চা আমরা দেখি আসছি, সেখানে ‘ধরে ধরে জবাই কর’— এই স্লোগান আমাদের অনেকের কানে স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই স্লোগান কি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয় না? এই স্লোগান শিশু-কিশোরদের মনে কী প্রতিক্রিয়া জন্ম দেয়? কিংবা বিদেশিরা এই স্লোগানকে কীভাবে পড়বে?

অথচ জুলাই অভ্যুত্থান আরও অনেক সম্ভাবনার সঙ্গে ৫৪ বছরের রাজনীতির সঙ্গে একটা স্পষ্ট ছেদবিন্দু আঁকার সুযোগ সামনে নিয়ে এসেছে।…১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে, যাদের বড় একটা অংশ শিশু ও ৩০ বছরের কম বয়সী, এই সুযোগ এসেছে।

অভ্যুত্থানের পরপরই আমরা দেখেছি, কোন দলের কতজন নেতা-কর্মী শহীদ হয়েছেন, সেই তালিকা নিয়ে, রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যুত্থানে নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করছে। কিন্তু অভ্যুত্থানের যে স্পিরিট সেটাকে ধারণ করে নিজেদের চর্চা পাল্টানোর তাগিদ কার মধ্যে কতটা দৃশ্যমান?

… ৫ আগস্টের পর গত সাড়ে ৮ মাসে দেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কিন্তু থেমে নেই; বরং যেকোনো বিবেচনাতেই এ সংখ্যা আশঙ্কাজনক। আর সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার হয়েছেন বিএনপির কর্মীরা, সেটা ভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাতে যতটা, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি নিজেদের কোন্দলে।…১২ এপ্রিল দৈনিক সমকালের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, আট মাসে দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে বিএনপির ৫১ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

এই যে এত এত মানুষের মৃত্যু, তার রাজনৈতিক মূল্য কতটুকু? এসব মৃত্যু ঘটেছে কর্মীদের মধ্যে রেষারেষি, নেতাদের মধ্যে বিরোধ, মূল সংগঠনের সঙ্গে অঙ্গসংগঠনের মতভিন্নতা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ক্ষমতার বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, দখল, ঠিকাদারি, চাঁদাবাজি, বালু ও মাটি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ঘটা সংঘর্ষে।

কিন্তু এই সংঘাত থামাতে, এই অযথা অমূল্য রক্তপাত বন্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন বিএনপির নেতৃত্ব? কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাঁরা। অন্য দলগুলোও বা কী ব্যবস্থা নিয়েছে।

নিজ দলের রাজনৈতিক কর্মীরা যখন একই দলের কর্মীদের হাতে খুন হচ্ছেন, তখন একটা শব্দও উচ্চারণ হতে আমরা দেখি না। কিন্তু যে দলের কর্মীই হোক, কিংবা রাজনৈতিকভাবে যে আদর্শকেই ধারণ করুক না কেন, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। একজন সহনাগরিকের মৃত্যু কেন কোনো অনুভূতি, কোনো বোধ তৈরি করতে পারে না‌

… বাংলাদেশের রাজনীতি গোত্রবাদী চর্চা থেকে খুব বেশি পা যে এগোতে পারেনি, রাজনৈতিক খুনোখুনি তারই প্রতিচ্ছবি। নতুন চর জাগলে কিংবা আধিপত্য বিস্তারের প্রয়োজনে একসময় এখানে বল্লম, টেঁটা নিয়ে বিবদমান দুই গোষ্ঠী খুনোখুনিতে মেতে উঠত।…এই মানসিকতাও রাজনীতিতে পুনর্লিখিত হয়েছে।

বাংলাদেশের একেবারে জন্মলগ্ন থেকেই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডকে একটা বৈধতা দেওয়ার রেওয়াজ চালু রয়েছে। নব্বই থেকে শুরু করে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে…রাজনৈতিক সহিংসতায় হত্যার শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৫১৯ জন। এই সময়ে আহত হয়েছেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ।

… রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে ‘স্বাভাবিকতা’ পেয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর চর্চায় অন্য দল ও নিজ দলের নেতা-কর্মীদের হত্যা নিছক রাজনৈতিক এজেন্ডার বিষয়। এখানে নাগরিক হত্যার কোনো মানবিক মূল্য নেই। আমরা কি সামনে এগোতে পারব না গোত্রতন্ত্রের রাজনীতি থেকে। ‘ধরে ধরে জবাই কর’— স্লোগান স্থায়ীভাবে বন্ধ হোক রাজনীতি থেকে।”


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন