“… বাংলাদেশে গত দেড় দশক মানুষ স্বচ্ছ নির্বাচন চেয়ে চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, সেটা সত্য। কিন্তু চব্বিশের অভ্যুত্থান সেই চাওয়ার সঙ্গে আরও বহু আকাঙ্ক্ষা যুক্ত করেছে। চব্বিশ এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। এক নতুন তরুণ সমাজের উত্থান ঘটিয়েছে। এ মুহূর্তে দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী প্রায় সোয়া তিন কোটি। আরেকভাবে দেখা যায়, ২৯-এর কম বয়সী জনসংখ্যাই দেশে ৫৭ ভাগ। এদের সবাই ভোটার নয়। কিন্তু এরাই তো আজ ও আগামীকালের বাংলাদেশ। এখনকার সমাজ ও রাজনীতিতে এই ৫৭ ভাগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্গ। চব্বিশ এদের বিশেষভাবে পাল্টে দিয়েছে। পরিবারতন্ত্রের ছায়ায় বড় হওয়া এতদিনকার রাজনৈতিক আবহে তারা সন্তুষ্ট নয়। অচিন্তনীয় এক অর্জনে তারা সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্ম।
… বাংলাদেশে চব্বিশে বিপ্লব ঘটে যায়নি-এটা সত্য; কিন্তু বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। বিপ্লবী পার্টি থাকলে অনায়াসে এখানে পুরোনো এস্টাবলিশমেন্টকে ছুড়ে ফেলে দেশ এগিয়ে যেতে পারত। এস্টাবলিশমেন্টের সৌভাগ্য সেটা হয়নি। তাই বলে রাজপথে জন্ম নেওয়া বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করে কেউ এগিয়ে যেতে চাইলে সেটা শেখ হাসিনার মতোই একরোখা আচরণ হবে। বিএনপির সঙ্গে আজকের শহুরে – শিক্ষিত – মধ্যবিত্ত -উচ্চবিত্ত তারুণ্যের এখানেই মতাদর্শিক দূরত্ব দেখা যাচ্ছে। এই দূরত্ব সংঘাতের চেহারা নিয়ে তেতে উঠছে।… তারেক রহমান ও তাঁর দল নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগের মতো করে এ রকম দ্বন্দ্বে জিততে চান না। কিন্তু বিএনপির মেঠো সংগঠক ও কর্মী দল সেটা চাইতে পারেন। ছাত্র নেতৃত্বকেও সেদিকে উসকে দিতে পারে কেউ। এই শঙ্কার সুরাহা কী?
এর ফলে যে অবস্থা তৈরি হবে বা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেখানে কট্টরপন্থীরা ‘সম্ভাবনা’ দেখছে। গত আট মাসে তারা আট বছরের চেয়ে বেশি এগিয়েছে। নির্বাচনে দক্ষিণপন্থী দলগুলো কত আসন পাবে, সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু তাদের ভোেট যে অনেক বাড়বে সে বিষয়ে সমাজমনস্ক কেউ দ্বিমত করবে না। আবার ‘ভোট’ বাড়ার চেয়েও বড় ঘটনা হলো সামাজিক শাসকের জায়গায় নিজেদের স্থাপন করতে পারা। কিন্তু একটা ‘থিওলজিক্যাল স্টেট’ কি আদৌ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল? যদি তা না হয় তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রাতারাতি মধ্য-বাম মেরুকরণ থেকে মধ্য-ডান মেরুকরণে বদলে যাওয়াকে কে থামাবে?
… প্রশ্ন হলো, দেশের প্রধান দলের দাবিদার বিএনপি এবং তার নেতৃত্বও চব্বিশকে এভাবে বিকৃত হতে দেবে কি না? ছাত্র-তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে ৩১ দফাকে আরও সময়োপযোগী ও বিস্তারিত করতে সমস্যা কোথায়? রাজনীতি তো মানুষের জন্য। তাহলে ৩০-অনূর্ধ্ব ৫৭ ভাগের সঙ্গে বিএনপির সংলাপ হতে সমস্যা কোথায়? ১৯৭২-৭৩ এর প্রধান রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় দেশ ও সমাজকে পুনর্গঠন এবং পাকিস্তানি ধাঁচের রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার করতে না পেরে যদি ব্যর্থ হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৫-এর প্রধান দলও চব্বিশের আকাঙ্ক্ষায় নিজেকে পুনর্গঠন করতে না পারলে বিধ্বংসী ফল আসবে। ক্ষমতায় না থেকেও নিশ্চিতভাবে বিএনপি ঐতিহাসিক সেই দায়ভারের মুখোমুখি। বাংলাদেশকে বদলে দিতে হলে বিএনপিকেও অনেকখানি বদলে যেতে হবে।
বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন। কিন্তু নির্বাচনের আগে আগে সমানতালে দ্রুত আরও কিছু প্রয়োজন মনে করছে তরুণ সমাজ।… কাজিয়া নয়, জিততে হবে অভ্যুত্থানের সব শক্তিকে। তা না হলে শেষ বিচারে দক্ষিণপন্থা জিতবে। বাংলাদেশ হারবে। “


