বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকাল বেশিরভাগ মানুষই ষাট বছর বা তার বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকার প্রত্যাশা করতে পারেন। প্রতিটি দেশেই বয়স্ক জনসংখ্যার সংখ্যা ও অনুপাত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতি ছয়জনের একজনের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি হবে। ২০২০ সালে যেখানে বিশ্বব্যাপী ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা ১ বিলিয়ন ছিল তা ২০৩০ সালের মধ্যে ১.৪ বিলিয়নে উন্নীত হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ২.১ বিলিয়নে পৌঁছাবে। ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা ২০২০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪২৬ মিলিয়নে পৌঁছাবে।
যদিও এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তন প্রথমে উন্নত দেশগুলিতে (যেমন জাপানে ইতোমধ্যে জনসংখ্যার ৩০% ৬০ বছরের বেশি) শুরু হয়েছিল, এখন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করবে। জৈবিক স্তরে বার্ধক্য হল দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন আণবিক ও কোষগত ক্ষতির কারণে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার ক্রমশ হ্রাস রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং অবশেষে মৃত্যুর ফল।এই পরিবর্তনগুলি সরলরৈখিক নয় বা ধারাবাহিকও নয় এবং এগুলো কেবলমাত্র ক্যালেন্ডার-বয়সের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কযুক্ত নয়।
জৈবিক পরিবর্তনের বাইরেও বার্ধক্য প্রায়ই জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সাথে জড়িত থাকে। যেমন অবসর গ্রহণ, নতুন বাসস্থানে স্থানান্তর এবং বন্ধু বা জীবনসঙ্গীর মৃত্যু। বার্ধক্যের সাথে সম্পর্কিত সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে যেসব সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে-শ্রবণশক্তি হ্রাস, ছানি এবং দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত সমস্যা, পিঠ ও ঘাড়ের ব্যথা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, ডায়াবেটিস, বিষন্নতা ও ডিমেনশিয়া। এছাড়াও বয়স্কদের মধ্যে জেরিয়াট্রিক সিনড্রোম নামে পরিচিত বেশ কিছু জটিল স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দেখা যায়। যেগুলো একাধিক কারণের ফলে সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে রয়েছে-দুর্বলতা, মূত্রনিয়ন্ত্রণে অসুবিধা, পড়ে যাওয়ার প্রবণতা, বিভ্রান্তি এবং চর্মঘা।
দীর্ঘায়ু শুধুমাত্র বয়স্ক ব্যক্তি ও তাদের পরিবারদের জন্য নয় বরং পুরো সমাজের জন্যই সুযোগ নিয়ে আসে। অতিরিক্ত বছরগুলো নতুন কিছু শেখার, নতুন পেশা গ্রহণের বা পুরোনো শখ পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ এনে দেয়। তবে এসব সুযোগ ও অবদান অনেকটাই নির্ভর করে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর সেটি হলো স্বাস্থ্য। গবেষণা বলছে দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সুস্বাস্থ্যের অনুপাত তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তিত রয়েছে। যার মানে হলো এই অতিরিক্ত বছরগুলো প্রায়শই অসুস্থতার মধ্যে কাটে। যদি মানুষ তাদের বাড়তি বছরগুলো সুস্থতার মধ্যে কাটাতে পারে এবং যদি তারা সহায়ক পরিবেশে বসবাস করে তবে তাদের সক্ষমতা একজন অপেক্ষাকৃত তরুণ ব্যক্তির তুলনায় খুব বেশি ভিন্ন হবে না। বিপরীতে যদি এই বছরগুলো শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার অবনমনে পরিপূর্ণ হয়, তবে তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই নেতিবাচক পরিণতি বয়ে আনবে।
যদিও বার্ধক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পার্থক্য জেনেটিক, বেশিরভাগ পার্থক্য নির্ভর করে ব্যক্তি কোন পরিবেশে বড় হয়েছে তার ওপর। পরিবার, প্রতিবেশ, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অবস্থা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুস্থ জীবনযাত্রার অভ্যাস যেমন, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান পরিহার-বার্ধক্যের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সাহায্য করে এবং শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা উন্নত করে। বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জ ও নীতি বয়স্ক জনগোষ্ঠী সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা বিদ্যমান। তাদের প্রায়ই দুর্বল, নির্ভরশীল ও সমাজের জন্য বোঝা হিসেবে দেখা হয়। এই ধরনের বয়সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করতে পারে এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।
বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, নগরায়ন, অভিবাসন ও পরিবর্তিত লিঙ্গগত ভূমিকা, সবকিছুই বার্ধক্যের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করছে। তাই জনস্বাস্থ্য কৌশল নির্ধারণের সময় এই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রবণতাগুলোর প্রতি নজর দেওয়া জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিক্রিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২১-২০৩০ সালকে “সুস্থ বার্ধক্যের দশক” হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (WHO) এর নেতৃত্ব দিতে বলেছে।
এই দশকটি চারটি মূল ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। সেগুলো হলো – বয়স ও বয়স্কদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। বয়স্কদের উপযোগী ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান। যাদের প্রয়োজন তাদের জন্য মানসম্মত দীর্ঘমেয়াদী সেবার ব্যবস্থা করা। এই উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে সহায়তা করা হবে এবং বিশ্বব্যাপী বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সুস্থতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।


