পৃথিবীর এই হাহাকারের সার্কাস থেকে বিদায় নিয়েছেন গীতিকার, সুরকার, এবং সঙ্গীতশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়। তার সঙ্গীতের মধ্যে ছিল জীবনের কাঠিন্য -গভীরতার এক অনবদ্য প্রতিফলন। গানের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। খুব অল্প বয়সে তিনি নিজেই গানের সুর আর লেখা শুরু করেন। ১২ বছর বয়সেই প্রথম কবি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় সুর দিয়েছিলেন। ঘন্টার পর ঘন্টা কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই খালি গলায় গান গেয়েছেন। ছিলো আন্দোলনের গান, লড়াইয়ের গান, ভালোবাসার গান। সঙ্গীত যাত্রার প্রথম গান ছিল “আমার গানের সুরে”। ১৯৬৭ সালে রেডিও কলকাতায় সম্প্রচারিত হওয়া এটি প্রথম প্রকাশিত গান। এই গানটি ছিল সঙ্গীত জীবনের প্রথম সাফল্য এবং এটি তাকে বাংলা সঙ্গীত জগতে একটি নতুন পরিচিতি এনে দেয়।
এরপরে ‘পাথরে পাথরে নাচে আগুন’ (১৯৮৮) দিয়ে হয় প্রথম অ্যালবাম। যদিও অন্য শিল্পীরাও ছিলেন এতে। ১৯৯৪ সালে ‘যেতে হবে’ দিয়ে প্রথম একক অ্যালবামের শুরু। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানগুলি ঐতিহ্যে অনন্য স্থান দখল করেছে। তাঁর বিখ্যাত গান “আমি বাংলায় গান গাই” (১৯৭১) এবং “ডিঙা ভাসাও সাগরে” (১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় স্মৃতির সঙ্গে জড়িত, যা বাংলার মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। এছাড়াও তাঁর অনেক গানই সংগ্রামী ও স্বাধীনতার আবেগে পূর্ণ, যেমন “আলু বেচো” (১৯৭৪), “ছোকরা চাঁদ” (১৯৭৫), “তোমার কি কোনো তুলনা হয়” (১৯৭৬), “ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ” (১৯৭৮), “কাঁচের বাসনের ঝনঝন শব্দে” (১৯৮০) এবং আরও অনেক গান।
“স্বপ্নের ফেরিওয়ালা” (২০০০) এবং “হযবরল” (২০০৪) এর মতো অ্যালবামগুলোতে তিনি নিজস্ব বৈচিত্র্যময় সঙ্গীত ধারার পরিচয় দিয়েছেন। শেষ অ্যালবাম ছিলো ‘ভোর’ (২০২২)। তাঁর সময়ের এক প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন তিনি। শুধু গানই করেননি, বরং সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতাও প্রকাশ করেছেন। সুরে, তার কথায় তিনি বাংলার সংস্কৃতির গভীরতম অনুভূতি তুলে ধরেছেন। গানগুলি ছিল সংগ্রামী, উজ্জীবিত, এবং আধুনিক বাংলার ঐতিহ্যের এক অমূল্য রত্ন। দীর্ঘ সময় অসুস্থ থাকার পর, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে কলকাতার পিজি হাসপাতালে প্রতুল মুখোপাধ্যায় পরলোক গমন করেন। “ডিঙা ভাসাও সাগরে” গানের সুরে যেখানেই ডিঙা ভাসিয়ে চলে যান না কেন, চিরকাল বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।


