প্রবল গণআন্দোলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার পরই আমি প্রথমবারের মতো ভারতের বৈশ্বিক হিন্দু জাতীয়তাবাদী অনলাইন ট্রল বাহিনীর মুখোমুখি হই । তাদের কৌশল ও পদ্ধতি তখনই আমার চোখ খুলে দেয়। … ভারত উদ্বেগ জানাতে থাকে , হাসিনার প্রস্থানের পর বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুরা সহিংসতার শিকার হচ্ছে । শুরু হয় অনলাইনে অপপ্রচার । ভারতীয় গণমাধ্যমের সদস্যরা দাবি করছে ইউনূস সরকার নাকি বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থীদের শক্তিশালী করেছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ।
ভারত ও প্রবাসী ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো ভারত সরকারের মনোভাব প্রতিফলিত এবং প্রভাবিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে হেয় করার এবং বিদেশী রাষ্ট্রের নীতি কৌশলকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে আগ্রাসী এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা শুরু করেছে । ‘ইন্টারনেট হিন্দু’ নামে পরিচিত এই ‘কীবোর্ড যোদ্ধারা’ প্রধানত মোদী সরকারের বিজেপি এবং তার জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ ‘হিন্দুত্ববাদের’ অনুসারী । এটি এমন এক মতাদর্শ যা মনে করে ভারত ও হিন্দুধর্ম সমার্থক এবং সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ধর্মনিরপেক্ষ দেশটিকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করা উচিত।
হাসিনার সমর্থকরা তাদের পুরনো দাবি পুনরায় চালিয়ে যাচ্ছে । বলছে , একমাত্র তিনিই ইসলামপন্থীদের কবল থেকে দেশকে রক্ষা করেছেন । যদিও বাস্তবতা হলো , অধিক রক্ষণশীল ইসলামী দলগুলো কখনও ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন পায়নি । এই প্রচারণার লক্ষ্য হলো হাসিনা ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া। তারা বয়ান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র , পাকিস্তান এবং অন্যান্য দেশের রহস্যময় ‘ডিপ স্টেটের’ চালকরাই হাসিনাকে সরিয়েছে ।
বাংলাদেশে কথিত হিন্দু ‘গণহত্যা’ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রচারের ফলে সহিংসতার প্রকৃত ঘটনা চিহ্নিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে । ভারতের চলমান চাপ বাংলাদেশে একটি তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে । এমন পরিস্থিতিতে কট্টর ভারতবিরোধীদের প্রচারণার চাপে মধ্যপন্থী কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাচ্ছে । এই ফাঁকে এগিয়ে এসেছে পাকিস্তান ও চীন । তারা বাংলাদেশের নতুন সরকারকে আলিঙ্গন করার জন্য কূটনৈতিক , সামরিক এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ জোরদার করেছে। মোদি সরকারের উচিত হিন্দুত্ববাদী ট্রল বাহিনীর উপর লাগাম টানা, কারণ এই বিপজ্জনক প্রচারণা দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি করছে ।
এদিকে ভারতীয় সরকার , গণমাধ্যম , নীতিনির্ধারনী প্রতিষ্ঠান এবং ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর গৃহিত পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশের ভেতরও ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে । বিশেষত যারা গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল , তাদের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাবকে উস্কে দিয়েছে।বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।তবে তা ভারতের কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে কীভাবে সহায়ক হবে তা বলা মুশকিল ।
আমার বিশ্বাস ভারত এবং বাংলাদেশের সামনে এই পরিস্থিতি এড়ানোর সুযোগ রয়েছে । শুরুটা উপর থেকে হতে হবে । উভয় সরকার তাদের সমর্থকদের বার্তা দেবে যে দুই প্রতিবেশী দেশ নতুনভাবে শুরু করে একে অপরকে উপকৃত করতে পারে । জন ড্যানিলোভিচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা , ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে ডেপুটি চিফ অফ মিশন ছিলেন বেনার নিউজ. ২২.০১.২০২৫


