“… সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে ভারত-পাকিস্তান যখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বলে মনে করা হচ্ছে, সেই সময়ে গত বুধবার (৩০ এপ্রিল) বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মহড়া পর্যবেক্ষণ অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে চারদিকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধের হুমকি থাকায় প্রস্তুতি না নিয়ে থাকা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, ‘অনেকের মতো আমিও যুদ্ধবিরোধী মানুষ। পৃথিবীতে যুদ্ধ হোক, এটা কামনা করি না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে প্রস্তুতি না নেওয়াটা আত্মঘাতী এবং প্রস্তুতি নিতে হলে আধাআধি প্রস্তুতির কোনো জায়গা নেই। এটা এমন এক পরিস্থিতি, জয়ই একমাত্র অপশন। পরাজয় এখানে কোনো অপশন হতে পারে না। কাজেই আমাদের প্রস্তুতি কত উচ্চ পর্যায়ে নিতে পারি, তার চেষ্টা থাকতেই হবে।’
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সত্যিই যুদ্ধে জড়াবে বা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জড়ালে তার অংশ হবে? হয়তো না। কিন্তু যুদ্ধে না জড়ালেও সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখা নানা কারণেই জরুরি। নিজের দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য তো বটেই।
যদিও বাংলাদেশের মতো একটি দুর্বল অর্থনীতির দেশ সামরিক খাতে কতটা শক্তিশালী হবে বা হতে পারবে—সেটি আরেকটি তর্ক। কেননা মাথায় রাখতে হবে, মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলের একটি দেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষ বসবাস করে—যাদেরকে প্রতিনিয়ত খাদ্য-বস্ত্রী-বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ নিয়েই চিন্তা করতে হয়। সুতরাং সামরিক খাতে অনেক বেশি ব্যয় করার সুযোগ নেই।
কিন্তু ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় অবস্থিত বলে বাংলাদেশ যদি সামরিক দিক দিয়ে খুব দুর্বল হয়ে থাকে, সেটিও কাজের কথা নয়।
ভারত-পাকিস্তান এই উত্তেজনার ভেতরেই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তও অস্থির। পুরো সীমান্তে এখন মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মিন নিয়ন্ত্রণ এবং রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রধান ভূমি রাখাইন রাজ্যটিও আরাকান আর্মির দখলে। সেখানে মিয়ানমার সরকারের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আগে থেকে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে সম্প্রতি আরও এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা যু্ক্ত হয়েছে।
… সেটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বে কোনো ধরনের হুমকি তৈরি করবে কি না বা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা বলা যায় না। সুতরাং এই বাস্তবতায় মাথায় রেখেও হয়তো ড. ইউনূস যুদ্ধের প্রস্তুতি রাখতে বলেছেন।
… সামরিক উত্তেজনা কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং এটি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি খরচ, খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজারে অস্থিরতার সৃষ্টিও কারণ হতে পারে। এজন্য বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত হবে অর্থনৈতিক প্রস্তুতি নেওয়া, যেমন : জরুরি খাদ্য ও জ্বালানির মজুদ, রেমিট্যান্স প্রবাহের সুরক্ষা, কূটনৈতিক বাণিজ্য বিকল্প প্রস্তুতি ইত্যাদি।
সর্বোপরি, বাংলাদেশ সরাসরি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার অংশ না হলেও এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘নিরপেক্ষ’ থাকা মানেই ‘নিষ্ক্রিয়’ থাকা নয়। বরং সতর্কতা, প্রস্তুতি ও কৌশলগত সক্রিয়তা—এই তিনটি মিলে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, আত্মনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে। …”


