২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে শুরু করে চলমান মে মাসজুড়ে বাংলাদেশ জুড়ে ঘন ঘন বজ্রপাতের ঘটনা নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুধু ৩০ এপ্রিল, বুধবারেই দেশের অন্তত ছয়টি জেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন বিশজনেরও বেশি মানুষ। প্রতি বছর গ্রীষ্মের শুরুতেই এমন ঘটনা নতুন নয় বটে, তবে এবারের ঘটনা সংখ্যার দিক থেকে নজরকাড়া এবং চিন্তারও বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভূগোল ও জলবায়ু এই প্রবণতার মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ ফারুখের ভাষ্য অনুসারে, ‘‘একদিকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বাতাস এবং অন্যদিকে উত্তরের হিমালয় থেকে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অত্যন্ত উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।’’ এই দুই প্রবাহের সংঘর্ষ থেকে সৃষ্ট অস্থির বায়ুপ্রবাহই মূলত বজ্রঘন মেঘ (Cumulonimbus cloud) তৈরি করে, যা থেকে বিদ্যুৎচমক ও বজ্রপাত সংঘটিত হয়।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলছে ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে ১৪০০ জনের মৃত্যু হলেও, প্রকৃত সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে। শুধু এপ্রিল ২০২৫-এ বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে (বিশেষ করে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, পঞ্চগড়, নওগাঁ, সুনামগঞ্জ) সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রেক্ষিতে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক বজ্রপাতের ঘনত্বের সঙ্গে। আন্তর্জাতিক একাধিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রতি ১°C বৃদ্ধিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ১০–১২% পর্যন্ত বাড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো আর্দ্র অঞ্চলে এই প্রবণতা আরও বেশি প্রভাবশালী। জাতিসংঘের “Global Climate Risk Index 2024”-এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে। বজ্রপাতও নতুন আরেকটি জলবায়ু-প্রণোদিত ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় ভেনিজুয়েলার মারাকাইবো হ্রদ অঞ্চলে এবং ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলে। তবে ড. ফারুখের ভাষায়, “তুলনামূলক উন্নত দেশের মানুষ সচেতন থাকায় মৃত্যুহার অনেক কম।” বাংলাদেশে এই চিত্র ভিন্ন। দেশের ৪০% কর্মক্ষম মানুষ খোলা মাঠে কৃষিকাজ, মাছ ধরা কিংবা নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বৈরি আবহাওয়ার সময় আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ ও চর্চা সীমিত। আবার গত কয়েক দশকে গ্রামাঞ্চলে বড় গাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বজ্রপাত সরাসরি মানুষের ওপর আঘাত করার ঝুঁকি বেড়েছে। খোলা স্থানে উঁচু বৃক্ষের ভূমিকা বজ্রের আকর্ষণ শোষণ করত, যা এখন কমছে। বাংলাদেশ জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (২০২১–২০২৫) বজ্রপাতকে ‘High Impact Sudden Hazard’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, অর্থাৎ ভূমিকম্পের মতোই আকস্মিক ও প্রাণঘাতী দুর্যোগ।
সচেতনতার ঘাটতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে বজ্রপাতকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ২০২২ সালে দেশের আটটি এলাকায় পরীক্ষামূলক বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র (Lightning Detection Sensor) স্থাপন করা হয়েছে—ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, খুলনা, পটুয়াখালী ও চট্টগ্রামে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা এই সেন্সর প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২০ কোটি টাকা। প্রকল্প কর্মকর্তাদের মতে, ‘‘সেন্সরগুলো ৩০–৪৫ কিমি দূরত্বের বজ্রপাতও শনাক্ত করে আগাম সতর্কতা পাঠাতে সক্ষম।’’ ২০২৫ সালের শুরু থেকে এই সেন্সরগুলোর মাধ্যমে অন্তত ৭৫টি আগাম সতর্কতা বার্তা পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৫২টি সঠিকভাবে সময়মতো পৌঁছেছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। যদিও এখনো এই বার্তা মাঠপর্যায়ে দ্রুত পৌঁছানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা (যেমন: SMS-based mass alert system বা কমিউনিটি রেডিও) সর্বত্র চালু হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তি স্থাপন যথেষ্ট নয়; জনসচেতনতা বাড়াতে স্কুলপাঠ্যবই, কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা জরুরি। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ ত্যাগ করা, বড় গাছের নিচে না দাঁড়ানো, মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখা, লোহার বস্তু থেকে দূরে থাকা—এসব সাধারণ সতর্কতা অধিকাংশ মানুষ মানেন না বলে একাধিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। অন্যদিকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য (SDG-13: Climate Action) অর্জনের অংশ হিসেবে বজ্রপাতের মতো জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট দুর্যোগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অভিযোজন (Climate Adaptation) পরিকল্পনা নিতে হবে বলে মত দিচ্ছেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা। বিশেষত হাওড়াঞ্চলে বজ্রপাত-নিরোধক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বজ্রনিরোধক কন্ডাক্টর বসানো এবং বজ্রবান্ধব চাষাবাদ কৌশল শেখানো সময়োপযোগী হবে।
বাংলাদেশের বজ্রপাত এখন আর নিছক ঋতুবদলের দৃষ্টান্ত নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব ও প্রাণঘাতী প্রতিফলন। প্রযুক্তি ও সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগেই এই নীরব ঘাতকের প্রকোপ কমানো সম্ভব। অন্যথায় আমাদের কৃষিজীবী-প্রধান জনপদগুলো প্রতিবছরই এই বিপদের বলি হতে থাকবে।


