অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নতুন বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক রাহীদ এজাজ’র সঙ্গে। ২য় পর্ব থেকে কিছু জরুরি অংশ। শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা ও বিচার এসবে আমাদের থাকার দরকার নেই। আমরা বিচারব্যবস্থা সংস্কারে বসেছি। বিচারব্যবস্থার সংস্কার করলে সংস্কারের ভেতর দিয়ে কার বিচার করবেন, কীভাবে বিচার করবেন, কে বিচার করবে, সবকিছু আসবে। এখন আমরা তো পলিটিক্যাল ডিসিশন দিতে যাচ্ছি না।
বিতর্কিত মামলা এবং গ্রেপ্তার … এ আইনগুলো পাল্টানো দরকার। কাজেই সেভাবেই আসতে হবে। আমরা এককভাবে একটা ঘোষণা দিয়ে দিলাম, তাহলে তো আবার আমরা একনায়কতন্ত্রের দিকে চলে গেলাম। আমরা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসতে চাচ্ছি। … বিচারপ্রক্রিয়া এমন জিনিস, এখানে যে ভুল হচ্ছে না, তা নয়। ভুলটা ধরিয়ে দিলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে … সংশোধন করার চেষ্টা করছি
মব জাস্টিস এখানে কোনো রাজনৈতিক বিষয় নেই। যে হত্যাকাণ্ড, মব জাস্টিস হচ্ছে, এগুলো হচ্ছে ল অ্যান্ড অর্ডারের বিষয়। ল অ্যান্ড অর্ডার শক্ত করতে পারলে এ জিনিসগুলো হবে না। সামাজিক তৎপরতা যদি বাড়াই, মানুষ মানুষের প্রতি যত্ন নেয়, তাহলে এগুলো হবে না। সরকার গিয়ে মারামারি থামাতে পারবে না। মারামারি করলে শাস্তি হবে, এটুকু আমরা বলতে পারি। … আমাদের মতের ভিন্নতা থাকতে পারে। এ জন্য কেউ কারও শত্রু নই।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা এটাও আমাদের কোনো সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। কাজেই যখন রাজনৈতিক দলগুলো বসবে, তারা সিদ্ধান্ত নেবে। যত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আছে, সেগুলো আমরা রাজনীতিবিদদের কাছে নিয়ে যাব। তাঁরা যেভাবে সিদ্ধান্ত দেন।
আওয়ামী লীগ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান কমিশন যদি মনে করে যে দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে, যখন নির্বাচনের বিষয় আসবে, সেখানে আলাপ হবে। অতএব ওটাও আবার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে যাবে। ওটা খসড়া করবে তারা। কমিশন করলেই যে সেটা চূড়ান্ত হয়ে গেল, তা কিন্তু নয়। কমিশনের সুপারিশ রাজনৈতিক দলের কাছে যাবে। রাজনৈতিক দল নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করে, আলাপ-আলোচনা করে এটার সিদ্ধান্ত দেবে, কোন দিকে আমরা অগ্রসর হব।
গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা আমরা এই ক্ষমতা চাই না। আপনারা মন খুলে লেখেন। … সমালোচনা করেন। না লিখলে আমরা জানব কী করে যে কী হচ্ছে আর কী হচ্ছে না। আমরা তো ফেরেশতা নই যে সবকিছু ঠিকমতো হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আপনারা বললে আমরা একটু সতর্ক হই। আমরা মিডিয়া কমিশনের কথা বলেছি। মিডিয়া কমিশন আমাদের ধরিয়ে দেবে, হয় আইনগুলো পাল্টানো দরকার, না হলে বাতিল করে দেওয়া দরকার। আমরা এখানে কোনো আইনের জন্য লড়াই করছি না।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ আমাদের কাছে কাজটা তো পরিষ্কার। কাজটা হলো নির্বাচনের প্রস্তুতি। এই কাজ আমাদের শুরু করে দিতে হবে। কাজেই নির্বাচনের প্রস্তুতির একটা স্ট্রিম চলতে থাকবে। তার সঙ্গে সংস্কারের কাজ। দুটি একসঙ্গে যাবে। এটি কোনো আলাদা জিনিস নয়। একটা শেষ করে আরেকটা ধরব। নির্বাচনের প্রস্তুতি দিয়ে নির্বাচন চলবে। কখন, কোথায় কী করা যায়, কত দূর যাব। আবার সংস্কার। কারণ, সংস্কার হলো আমাদের কেন্দ্রবিন্দু। এই নির্বাচনটা হচ্ছে সংস্কারকে এস্টাবলিশ করার জন্য। কাজেই যখন দেখা যাবে নির্বাচনের প্রস্তুতিও হয়ে গেছে, সংস্কারের কাজ গোছানো হয়ে গেছে। এক্সিকিউট করা হয়নি। তখন প্রশ্ন উঠবে, সংস্কারটা করে যাবেন, নাকি নির্বাচনে চলে যাবেন। এটা আপনাদের বিষয়। আমরা প্রস্তুতিটা চালিয়ে যাব। …কাজেই সময় বেঁধে দিলাম, এর মধ্যে দেব। এর মধ্যে যা পান দিয়ে যান, এ রকম তো বিষয়টা নয়।
ভারত ও চীন অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পানির প্রবাহ-যেদিক থেকেই চিন্তা করুন না কেন। একে অপরকে ছাড়া চলা তো আমাদের জন্য মুশকিল হয়ে যাবে। কাজেই এটা স্বাভাবিক যে আমাদের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ হতে হবে, সুসম্পর্ক হতে হবে সবকিছুতেই। … সার্বভৌম দুটি দেশের মধ্যে যে ধরনের সুসম্পর্ক হয়, সে ধরনের সম্পর্ক এটা। এটা আমরা সব সময় চেষ্টা করে যাব। কাজেই সাময়িক … বিষয়গুলো আমাদের ভুলে যেতে হবে। কে কার সম্পর্কে কী বলল, কটু মন্তব্য করল, এগুলো বলে লাভ নেই। এগুলো কথার ফুলঝুরি। বহু বছর আগে আমি বলেছিলাম, এটা আমাদের একটা বড় সুবিধা। আমরা যে দুই (ভারত-চিন) বিশাল অর্থনীতির মাঝখানে আছি, এটা আমাদের দুর্বলতা নয়, সবলতা। দুই দেশের কাছ থেকে আমরা শিখব। দুই দেশ আমাদের বাজার হবে। দুই দেশই আমাদের কাছে আসবে।
পশ্চিমা দেশ ও জাতিসংঘ আমরা দুটো বিষয়ে এমফেসাইজ করেছি জাতিসংঘে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা-যাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, তাদের সবার সঙ্গেই। আমাদের বাংলাদেশের সঙ্গে আগে যেভাবে লেনদেন হতো, সেটার চিন্তা থেকে বের হয়ে যেতে হবে। এখন আমরা বড় আকারে যেতে চাই, বড় চিন্তার মধ্যে যেতে চাই। আমাদের আদান-প্রদান সেই প্ল্যাটফর্মের ওপর হতে হবে।প্রথমত, চিন্তাটা ভিন্ন করতে হবে। অতীতের চিন্তা, অতীতের ক্রমধারায় করলে হবে না। দ্বিতীয়ত দ্রুত করতে হবে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকার যদি কাজ দেখাতে না পারি, তাহলে মানুষ উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। কাজেই তুমি যদি দিতে দিতে এমন সময় লাগালে, অন্তর্বতী সরকার চলে গেল, আরেকটা সরকার এসে কয়েক বছর কাটিয়ে গেল, তারপর এটা দেওয়া শুরু হলো, তখন এটা হয়তো কাজে লাগবে না। অতীত হয়ে গেছে। কাজেই মানুষের মধ্যে উৎসাহ থাকতে থাকতে টাকাটা দাও, যাতে আমরা কাজগুলো করতে পারি।
শেষ কথা … এই সুযোেগ আর আসবে না। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান মুহূর্ত। কাজেই এটা নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যে যাবেন না। সংস্কারে কী কী বিষয় হবে, সেটা নিয়ে বাগবিতণ্ডা করেন। কিন্তু সংস্কার, এটা করে যেতে হবে। দুই দিন পর যদি বলেন সংস্কার বাদ দেন, আমরা নির্বাচন করে চলে যাই ওটা যেন না হয়। সংস্কার না করে যেন নির্বাচন না করি। এটা আপনাদের সবার কাছে আমার আবেদন। এই সুযোগ হারাবেন না।
২ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে নেয়া সাক্ষাৎকার।


