বাংলাদেশের রক ছিল নতুন স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা : জো অ্যাডেটুনজি, সম্পাদক, দ্য কনভারসেশন, দ্য গার্ডিয়ান

বাংলাদেশে রক ‘এন’ রোল সংস্কৃতির বীজ বপন হয়েছিল ১৯৭১ সালে দেশের জন্মের সময়, যখন একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটি পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়। বিশ শতকের বেশিরভাগ সময়জুড়ে এই অঞ্চল ছিল এক ঐতিহ্যবাহী কৃষিনির্ভর দক্ষিণ এশীয় সমাজ। এর সঙ্গীতচিত্রে ছিল বাংলা লোকসংগীত, যেখানে ব্যবহৃত হতো তবলা, হারমোনিয়াম এবং একতারা।

এরপর আসে এক রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই রাজনৈতিক বিদ্রোহের সাথে সাথে জন্ম নেয় এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ, যা আমার গবেষণায় উঠে এসেছে।

স্বাধীনতার পর কিছু বাংলাদেশি শিল্পী, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা থেকে সংগীতশিল্পী হয়ে ওঠা আজম খান, পশ্চিমা সংগীত থেকে অনুপ্রেরণা নিতে শুরু করেন। তারা শুনতে থাকেন জিমি হেনড্রিক্স, জর্জ হ্যারিসন এবং দ্য ডোরস-এর মতো শিল্পীদের গান।

আজম খানের ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ ড্রামস, গিটার ও কি-বোর্ড ব্যবহার করে বাংলা সংগীতকে এক নতুন রূপ দেয়। বাংলাদেশের শ্রোতারা এমন কিছু আগে কখনো শোনেননি। লম্বা চুল, বেল-বটম প্যান্ট, স্টেডিয়াম কনসার্ট এবং জোরালো রাজনৈতিক-সামাজিক বক্তব্যপূর্ণ গান দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক সাংস্কৃতিক আইকন।

তার ১৯৭০-এর দশকের একটি বিখ্যাত গান “বাংলাদেশ”-এ তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত সদ্য স্বাধীন জাতির করুণ চিত্র তুলে ধরেন। সেখানে তিনি এক বস্তিতে জন্ম নেওয়া শিশুর মৃত্যু ও তার মায়ের আহাজারির বর্ণনা দেন। পুরো গানে ভর করে থাকে হতাশা, গিটার-নির্ভর সুর এবং “ও বাংলাদেশ!”—এই আকুতিভরা আহ্বান।

২০১১ সালে মৃত্যুবরণ করা আজম খান এক প্রজন্মের তরুণদের দেশীয় সংস্কার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখান। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন রক সংগীত এক দশক আগে জাতি, ধর্ম ও যৌনতা নিয়ে সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল, বাংলাদেশেও রক ‘এন’ রোল – বিশেষ করে আজম খানের উপস্থিতি মানুষকে বোঝাতে শুরু করে যে ভিন্ন এক জীবনও সম্ভব।

এক ভক্ত বলেছিলেন, “তিনি ছিলেন প্রচলিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহী।” তিনি আরও বলেন, “আমি আজম খানকে জিন্স পরতে দেখেছি বলেই আমিও পাঞ্জাবি ছেড়ে জিন্স পরতে শুরু করি।” তবে এই পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক নয়। “তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছিলেন এবং স্বাধীনচেতা মূল্যবোধ বিশেষ করে রক্ষণশীলতার বাইরে চিন্তার স্বাধীনতা ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন,” বলেছিলেন আরেকজন। “আমরা তখন রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠছিলাম।”

নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল এক ধরনের বিপ্লবী কাজ। ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশের সরকার বারবার সামরিক শাসন, কর্তৃত্ববাদ এবং সীমিত গণতন্ত্রের মধ্যে দোলাচলে ছিল। যদিও গ্রামীণ উন্নয়ন কিছু অর্থনৈতিক গতি এনেছিল, তবুও ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দেশের ৪১% মানুষ চরম দারিদ্রে বাস করত।

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হলেও বাংলাদেশ ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেটি বহাল রাখে। এর ফলে দেশটি আরও রক্ষণশীল হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে রক সংস্কৃতি ছিল এক বিকল্প জগত যেখানে সরকারবিরোধী সমালোচনা স্বাভাবিক ছিল এবং ধর্মীয় উগ্রতা ছিল বেমানান।

১৯৯০-এর দশকে গান এন’ রোজেস, পিংক ফ্লয়েড ও অ্যারোসমিথের মতো পশ্চিমা ব্যান্ড বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখনই গড়ে ওঠে দেশীয় রক ব্যান্ড রকস্ট্রাটা (metal-এর পথিকৃৎ), ওয়ারফেজ (Warfaze), লাভ রান্স ব্লাইন্ড (Love Runs Blind) এবং আরও অনেক। ইংরেজি নামের এ ব্যান্ডগুলো স্টেডিয়ামভর্তি শ্রোতার সামনে পারফর্ম করত, যারা লম্বা চুল, টি-শার্ট, বুট আর চেইন গলায় পরে আসতেন।

যেখানে ঐতিহ্যগত সংগীত ছিল শান্ত, সুশৃঙ্খল ও বসে বসে শোনার মতো, সেখানে রক কনসার্ট ছিল উত্তাল সিগারেটের ধোঁয়া, হেডব্যাং, মারামারি।শিল্পীরা মদ, গাঁজা এবং অন্যান্য মাদকও ব্যবহার করতেন, যদিও পাশ্চাত্য শিল্পীদের মতো অতটা নয়।

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বৈশ্বিক বাজারে যুক্ত হতে থাকে—পরিধান শিল্প রপ্তানি বাড়ে, হলিউড সিনেমা আসে, বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি হয় তখন শহরগুলোতে দ্রুত বৈষম্যও বাড়তে থাকে। একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে নতুন ধনীদের উত্থান। বাংলাদেশি রকাররা এই অসাম্যকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।

১৯৯৮ সালের গানে ওয়ারফেজ “ধূসর মানচিত্র”-এ বলেন, “রোজ পড়ে থাকে লাশ রাস্তায়”, আর “নীল মার্সিডিজ গর্বে ঘুরে বেড়ায়”, সেখানে “গণতন্ত্র চোখ টিপে হাসে”—এই কথাগুলো দিয়ে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ তুলে ধরেন। ১৯৯৭ সালে মাকসুদ ও ঢাকা “গণতন্ত্র” নামের গানে বলেন, “গণতন্ত্র এক সংবিধানিক গুন্ডাতন্ত্র।” তারা ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেন। “পরওয়ারদিগার” গানে, যার ভিডিও শুরু হয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বার্তায়, সেখানে তিনি বলেন—“অন্ধ উগ্রবাদী ও মৌলবাদীরা আমাদের ভবিষ্যৎ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।”

কিন্তু এরপর থেকে এই সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটালেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮ সালে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ও সমাজবিজ্ঞানী মাইদুল ইসলাম সরকারবিরোধী “মিথ্যা তথ্য” ছড়ানোর অভিযোগে কারাগারে যান, যার সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছর।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশে হাজারো বিরোধী মতাবলম্বীকে “রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের” অভিযোগে আটক রাখা হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে দেশজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার, শিল্পী ও সংখ্যালঘুদের উপর সহিংস হামলা বেড়েছে, যা প্রমাণ করে, স্বাধীন মত প্রকাশ ও নাগরিক স্বাধীনতা মারাত্মক সংকুচিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ আজ আবারও প্রতিবাদী সংগীতের জন্য তৃষ্ণার্ত। কিন্তু রক সংস্কৃতি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এর একটি কারণ ভারতের বলিউড সংগীত, যা জীবনের আনন্দ আর প্রেম উদ্‌যাপন করে। এই গানগুলো সহজে pirated কপি আকারে ছড়িয়ে পড়ে ও রেডিও দখল করে নেয়। এরপর আসে বাংলাদেশি আন্ডারগ্রাউন্ড হিপ-হপ সংস্কৃতি, যা আজকের তরুণদের বিদ্রোহের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

রকশিল্পীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষাও নিশ্চিত হয়নি। বাংলাদেশে মাত্র ১০% সংগীতই বৈধভাবে কেনাবেচা হয়, আর মিউজিক পাইরেসির কারণে শিল্পীরা প্রতিবছর প্রায় ১৮ কোটি মার্কিন ডলার হারান বলে মনে করা হয়।

ওয়ারফেজ ব্যান্ডের গিটারিস্ট সামির হাফিজ বলেন, “বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি আর রয়্যালটির ধারণা আমাদের সংস্কৃতিতে এখনও ভালোভাবে গেঁথে যায়নি।বাংলাদেশে রক মিউজিশিয়ান হিসেবে টিকে থাকা সত্যিই কষ্টকর।” ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, যা পশ্চিমা সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে, সেটাও রকের পতনে ভূমিকা রেখেছে। কিছু তরুণ মুসলমান রক ‘এন’ রোলকে এখনও পাপ হিসেবে দেখেন। এক সময় বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছিল রক সংগীত। আজ যেন সেই সংগীতের জন্য দেশে আর জায়গা নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন