বাংলাদেশের চাকুরীতে সংখ্যালঘুর আনুপাতিক উপস্থিতি, জনসংখ্যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যতিক্রম সামরিক বাহিনী

বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বহু খাত ও প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘু কর্মকর্তাদের উপস্থিতির হার দেশের মোট জনসংখ্যায় তাদের ৯% অনুপাতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ — এমনকি কিছু ক্ষেত্রে খানিকটা বেশিও। বাংলাদেশের জনপরিসরে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নেত্র নিউজের করা একটি বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে, বাংলাদেশ স্পষ্টতই প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো করেছে।

তবে, সামরিক বাহিনী এখনও রয়ে গেছে সংখ্যালঘুদের নাগালের বাইরে। নেত্র নিউজের হাতে আসা বাংলাদেশ সেনা ও নৌবাহিনীতে সক্রিয় কর্মকর্তাদের অতি-গোপনীয় দুইটি তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নৌবাহিনীর কমিশন্ড কর্মকর্তাদের মধ্যে সংখ্যালঘুদের হার ১%-এর সামান্য বেশি। আর সেনাবাহিনীতে ১%-এর কম।

নেত্র নিউজের বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনপ্রশাসনে সংখ্যালঘু কর্মকর্তাদের হার ১০.৫ শতাংশের বেশি, অধস্তন আদালতে ১০% ও পুলিশে ৯%। বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি সংখ্যালঘুর বাস, যা মোট জনসংখ্যার ৯%।

সংখ্যালঘুদের এই আনুপাতিক অংশগ্রহণ শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী শিক্ষকদের মধ্যে সংখ্যালঘুদের হার ১০ শতাংশেরও বেশি।

এর বাইরে পেশাজীবি সংগঠনগুলোতেও আছে তাদের কমবেশি আনুপাতিক উপস্থিতি। যেমন, দেশের শীর্ষ আইনজীবীদের সংগঠন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের ৮% ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ৮.৫৭% হলেন সংখ্যালঘু।

জনসংখ্যা ছাড়াও বিভিন্ন মেধাতালিকার সঙ্গেও এই পরিসংখ্যানের সঙ্গতি রয়েছে। যেমন, ঢাকা বিভাগে ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মেধাবৃত্তি পাওয়া ৩,২৩৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সংখ্যালঘুদের হার ৯.৬০%।

কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বেসামরিক সরকারের সকল পর্যায়ে বাংলাদেশ সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ সমভাবে নিশ্চিত করতে পেরেছে। বরং, উপরের পদগুলোতে সংখ্যালঘুদের পদচারণা কমে যেতে থাকে।

বিচারিক আদালতের সর্বোচ্চ পদ জেলা জজ ও তদুর্ধ্ব পদে প্রায় ৯৬% মুসলিম, যদিও নিম্ন আদালতে বিচারকদের মধ্যে মুসলমানদের সামগ্রিক হার ৯০%-এর কম।

বেসামরিক প্রশাসনে এই ব্যবধান আরও তীব্র : ৭৪ জন শীর্ষ-স্তরের সচিবের মধ্যে মাত্র একজন অমুসলিম। পুলিশে নেতৃত্বের পদগুলোতেও একই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যায়। ৮১ জন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল বা তার চেয়ে উচ্চতর পদে মাত্র ৫ জন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নাগরিক রয়েছেন।

অপরদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে দেশটির প্রধান সংখ্যালঘু গোষ্ঠী মুসলমানদের অংশগ্রহণ মাত্র ৪%, যদিও তারা জাতীয় জনসংখ্যার ১৪%।

জনসংখ্যার অনুপাত সমন্বয় করে নিলে বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিস ও পুলিশে কর্মকর্তা পর্যায়ে হিন্দুদের অংশগ্রহণ ভারতে মুসলমানদের অংশগ্রহণের ৩ থেকে ৪ গুণ।

সামরিক বাহিনীতে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ অনেকটা ভারতের মতোই। ২০১২ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী মুসলমান সম্প্রদায় থেকে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার কোরের সদস্য আছেন মাত্র ২%।

সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচকদের কারও কারও দাবি ছিল, দলটির আমলে প্রশাসন ও পুলিশের উচ্চতর পদে ব্যাপক আকারে হিন্দু কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হতো। নেত্র নিউজের বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলছে যে, এই ধরণের দাবি অনেকটাই অতিরঞ্জিত।

বরং, বাংলাদেশে যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক কোনো গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বা পক্ষপাত করা হয়ে থাকে, তার সব ধরণের লক্ষণ উপস্থিত সামরিক বাহিনীতে, যেখানে অমুসলিম কর্মকর্তাদের উপস্থিতি একেবারেই নগন্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন