২০১৮ সালে রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা সাইবেরিয়ার পারমাফ্রস্ট থেকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রায় ৩০০টি কৃমি শনাক্ত করেন, যাদের মধ্যে দুটি পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়। এই কৃমিগুলি হাজার হাজার বছর ধরে বরফে আটকে ছিল, কিন্তু গলানোর পর তারা আবার নড়াচড়া এবং খাদ্য গ্রহণ শুরু করে। এদের মধ্যে একটি কৃমির বয়স অনুমান করা হয়েছে প্রায় ৩২,০০০ বছর এবং অপরটির ৪১,৭০০ বছর। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে বিজ্ঞানীরা Panagrolaimus kolymaensis নামক আরও একটি কৃমি পুনরুজ্জীবিত করেন, যার বয়স প্রায় ৪৬,০০০ বছর।
এই আবিষ্কার শুধু প্রাণীবিদ্যার জন্য নয়, জীববিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, এমনকি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার জন্যও এক যুগান্তকারী ইঙ্গিত দেয়। এই গবেষণা প্রশ্ন তোলে পৃথিবীর বাইরেও কি অনুরূপভাবে বরফে জমে থাকা বা ঘুমিয়ে থাকা প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে?
আবিষ্কৃত এই কৃমিগুলি নেমাটোড (Nematode) নামক একধরনের সুক্ষ্ম প্রাণী, যাদের অনেকে ‘রাউন্ডওয়ার্ম’ নামেও চেনে। সাধারণত এরা মাটির নিচে বসবাস করে এবং গাছপালা বা অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর দেহে পরজীবী হিসেবে থাকতে পারে। তবে এই বিশেষ নেমাটোডগুলির যেটি ব্যতিক্রম তা হলো তারা ‘ক্রিপ্টোবায়োসিস’ নামক একটি বিশেষ অবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম।
ক্রিপ্টোবায়োসিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে প্রাণীর সমস্ত কার্যকলাপ বিপাক, বৃদ্ধি, পুনঃসংস্থান—প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা কার্যত মৃতের মতো নিস্তব্ধ থাকে। এই অবস্থায় তারা চরম পরিবেশগত পরিস্থিতিতেও বেঁচে থাকতে পারে, যেমন অতিরিক্ত ঠান্ডা, পানি-শূন্যতা, এমনকি বিকিরণ।
এমনকি বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে Panagrolaimus kolymaensis-এর জিনগত উপাদান অনেকাংশে C. elegans-এর (আরেকটি পরিচিত নেমাটোড) সাথে মেলে, বিশেষত যেসব জিন ক্রিপ্টোবায়োসিসে সাহায্য করে। এ থেকে অনুমান করা যায় এদের মধ্যে পূর্বপুরুষগতভাবে এই ক্ষমতা বিরাজমান ছিল।
প্রাচীন কালের জীবদের পুনর্জাগরণ প্রাণীবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এক বিপ্লব। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানীরা নানা উপায়ে DNA ও জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে অতীত জীবনের ধারা বোঝার চেষ্টা করছেন, কিন্তু একটি জীবন্ত নমুনা পাওয়া তাদের বহু প্রশ্নের উত্তর একসাথে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ এনে দেয়।এই নেমাটোডদের দেহে কীভাবে কোষ ক্ষয় প্রতিরোধ করে দীর্ঘদিন টিকে থাকা যায়, কীভাবে পানি-শূন্যতা ও চরম ঠান্ডা মোকাবিলা করা যায়, সে সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে এই গবেষণা চিকিৎসা বিজ্ঞান ও কোল্ড-স্টোরেজ প্রযুক্তির উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখতে পারে।
এই জীবদের বসবাস ছিল সাইবেরিয়ার পারমাফ্রস্টে এটি এমন এক ভূভাগ যা বছরের বেশিরভাগ সময় স্থায়ীভাবে বরফে আচ্ছাদিত থাকে। এর ফলে সেই বরফের নিচে হাজার বছর ধরে আটকে থাকা জীবদের সংরক্ষণ সম্ভব হয়েছে।
এই অঞ্চলগুলির পারমাফ্রস্টে প্রাচীন পরগাছা, পরজীবী ও অণুজীবদের খোঁজ পাওয়া ভূতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর DNA বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাচীন পরিবেশ, জলবায়ু ও বাস্তুসংস্থানের ইতিহাস জানা যায়। বরফে আটকে থাকা এই জীবরা দেখায় যে হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীর একটি অংশে তীব্র ঠান্ডা আবহাওয়া বিরাজ করেছিল এবং কিছু প্রাণী এতদিনেও টিকে গেছে।
এই আবিষ্কার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, যদি পৃথিবীর মতো একটি গ্রহে কয়েক হাজার বছর ধরে জমে থাকা প্রাণ আবার পুনরুজ্জীবিত হতে পারে, তবে কি মঙ্গল গ্রহ বা বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপার বরফের নিচে এমন কোনো ঘুমন্ত প্রাণী লুকিয়ে আছে?
মহাকাশ গবেষণায় বর্তমানে যেসব স্থানকে “হ্যাবিটেবল” বা বসবাসযোগ্য বলে বিবেচনা করা হচ্ছে, তার অনেকগুলোতেই বরফ বা হিমায়িত জল রয়েছে। যদি জীবনের অস্তিত্ব সেখানে ছিল বা এখনও আছে, তাহলে সেই প্রাণীদেরও ক্রিপ্টোবায়োসিসের মতো কোনও প্রক্রিয়ায় তারা হাজার হাজার বছর ধরে সংরক্ষিত থেকে যেতে পারে। NASA এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা ইতিমধ্যেই ইউরোপা ও এনসেলাডাসের বরফের নিচে তরল জল ও সম্ভাব্য জীবনের অনুসন্ধানে মিশন পাঠাতে আগ্রহী। এই কৃমিদের পুনর্জীবন সেই অনুসন্ধানে নতুন যুক্তি ও উৎসাহ যোগায়।
তবে এই আবিষ্কার যেমন উত্তেজনাপূর্ণ, তেমনি কিছু সতর্কতা ও প্রশ্নও সামনে এনে দেয়। যদি বরফে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন জীবাণু বা ভাইরাস ভবিষ্যতে গলে বেরিয়ে আসে, তাহলে তারা কি বর্তমান জীববৈচিত্র্য ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে? বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের পরিবেশ যদি দ্রুত হারে উষ্ণ হয়ে যায় এবং পারমাফ্রস্ট গলে যায়, তবে শুধু নিথর কৃমি নয়, আরও বহু প্রাচীন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া মুক্ত হতে পারে, যাদের প্রতিরোধে মানবদেহ প্রস্তুত নয়।


