ভারতের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ধারণা। অনেকের চোখে এটি একবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক চালচিত্র হিসেবে মনে হলেও কিন্তু এর বীজ বপন হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগেই। এবং এই বীজ বপনের প্রধান কারিগর ছিলেন তিনজন দার্শনিক-মনস্বী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাল গঙ্গাধর তিলক ও স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁরা তিনজনেই নিজ নিজ উপায়ে ভারতীয় ধর্ম-দর্শনের মধ্য দিয়ে এক জাতীয় চেতনার পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন। তবে প্রশ্ন হলো এই চেতনা কি কেবল মুক্তির বা আত্মজাগরণের পথ, নাকি এর মধ্যেই ছিল এক বিশেষধর্মী জাতীয়তাবাদের সংকেত?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪) ছিলেন উপনিবেশিক ভারতের প্রথম সাহিত্যিক যিনি “জাতীয়তা” শব্দটিকে ধর্মীয় রূপকে রূপান্তরিত করেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ যেখানে “বন্দে মাতরম্” গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ও একটি কাল্পনিক সন্ন্যাসী বিদ্রোহের মাধ্যমে এক ‘দেবী-মাতৃ’ ভারতের চিত্র তুলে ধরে। এখানে ‘ভারত’ আর নিছক ভৌগোলিক সত্তা নয়, বরং এক পূজনীয় মাতৃমূর্তি, যাঁর মুক্তির জন্য আত্মত্যাগ আবশ্যক।
এই মাতৃমূর্তি একাধারে দুর্গা, ভারতভূমি ও জাতিসত্তা তিনে মিলে এক। ফলে প্রশ্ন উঠেছে বঙ্কিম ধর্মীয় প্রতীকে জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করলেন, নাকি জাতীয়তাবাদকে ধর্মের আড়ালে উপস্থাপন করলেন? বঙ্কিমের চিন্তায় হিন্দুধর্ম ছিল শূন্য নয়, বরং সামাজিক পুনর্জাগরণের মাধ্যম। কিন্তু এই পুনর্জাগরণে মুসলিম ও অন্যান্য অনধিকারভুক্ত জনগোষ্ঠী কোথায় দাঁড়ায়, তা নিয়ে স্পষ্ট দ্বিধা দেখা যায়।
বাল গঙ্গাধর তিলক (১৮৫৬–১৯২০) ছিলেন ধর্মীয় ও রাজনীতির এমন এক মিলনের প্রতীক, যিনি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি “স্বরাজ আমার জন্মসিদ্ধ অধিকার” একদিকে রাজনৈতিক দাবির ভাষা, অন্যদিকে ধর্মীয় কর্তব্যের উচ্চারণ।
তিলকের গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় অবদান ছিল গীতা-র ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে ‘কর্মযোগ’-কে জাতীয় কর্তব্যে রূপান্তরিত করা। তিনি যুদ্ধ-প্রস্তুতির নৈতিক বৈধতা হিসেবে গীতার কুর্মদর্শনকে ব্যবহার করেন যেখানে “ধর্ম” মানে আত্মিক মুক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সংঘর্ষ। তাঁর গণেশ পূজা ও শিবাজী উৎসব ছিল জন-আন্দোলনের সাংস্কৃতিক মুখোশ। এগুলো হিন্দু প্রতীককে রাজনৈতিক চেতনায় রূপান্তরিত করে। এইভাবে তিলকের দর্শনে “হিন্দু” পরিচয়টি একটি সংগ্রামী, পুরুষতান্ত্রিক ও একাত্ম জাতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে, যেখানে ‘অপর’ মানেই মুসলিম বা বিদেশী শাসক। তাঁর চিন্তায় ধর্ম ছিল একতা নয়,এক বিভাজনের হাতিয়ার।
স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩–১৯০২) আন্তর্জাতিকভাবে হিন্দুধর্মের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর দর্শন ছিল মূলত আত্মপরিচয় ও জাতীয় চেতনার অভ্যন্তরীণ অন্বেষণ। তিনি “মানুষের সেবা মানেই ঈশ্বরের সেবা” দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও এক পর্যায়ে একটি শক্তিশালী জাতি নির্মাণের প্রচেষ্টায় রূপ নেয়।
“আমরা হিন্দু, আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত” এই উক্তির মাঝে বিবেকানন্দ জাতিগত আত্মসম্মানের আবেগকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন। কিন্তু এই আত্মসম্মান কাকে কেন্দ্র করে? এখানে “হিন্দু” পরিচয় একটি সাংস্কৃতিক জাতিসত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে দাঁড়ায়। বিবেকানন্দ একটি প্রাচীন ও গৌরবময় জাতির আত্মপরিচয় তুলে ধরতে ‘বেদান্ত’ ও ‘যোগ’ দর্শনকে ব্যবহার করেন, যা ঔপনিবেশিক আধিপত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। কিন্তু এই আত্মপরিচয় কতটা “সমন্বয়বাদী” আর কতটা “বর্জনবাদী” তা আজও বিতর্কের বিষয়।
বঙ্কিম, তিলক ও বিবেকানন্দ তাঁরা কেউ রাজনৈতিক নেতার ভূমিকায় ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের চিন্তা একটি ধর্মনির্ভর রাজনৈতিক আদর্শ গড়ে তোলে। এই তিনটি ভাবধারার সম্মিলনে যে “হিন্দু জাতীয়তাবাদ” গঠিত হয়, তা ছিল বঙ্কিমের হাত ধরে ধর্মীয় প্রতীকে আবেগ জাগানো, তিলকের চিন্তায় ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করা, আর বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক জাতিসত্তা নির্মাণ।
এই জাতীয়তাবাদ প্রথমে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ার হলেও কিন্তু পরবর্তীকালে তা হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের একরৈখিক প্রচেষ্টা, যেখানে বহুত্ববাদী সমাজের অন্য সম্প্রদায়ের স্থান সীমিত হতে থাকে।
দর্শন নাকি আদর্শিক মোড়ক?
আজকের ভারতবর্ষে হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটি রাজনৈতিক সত্য। কিন্তু এর শিকড় যে কত গভীরে, তা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় বঙ্কিম, তিলক ও বিবেকানন্দের দর্শনের দিকেও। তাঁরা কি সচেতনভাবে একটি বিশেষধর্মী রাষ্ট্রের ভাবনা দিয়েছিলেন? নাকি তাঁদের দর্শন পরে একরৈখিক ব্যাখ্যায় ব্যবহার করা হয়েছে?
একথা বলা যায় এই তিনজনই উপনিবেশিক চেতনার বিরুদ্ধে এক বিকল্প ভারতীয় আত্মপরিচয়ের সন্ধান করেছিলেন। তবে সেই সন্ধান ধর্মীয় সত্তায় এতটাই আবদ্ধ ছিল, যে তা একপ্রকার দার্শনিক সমন্বয়ের বদলে, আদর্শিক ছাঁকনি হয়ে ওঠে। দর্শনের ভাষায় বললে এ ছিল এক ontological collapse, যেখানে নিদিষ্ট ধর্মীয় চেতনাকে জাতিসত্তার একমাত্র উৎস ভাবা হয়েছে এবং তাতেই রচিত হয়েছে এক শ্রেণির জাতীয়তাবাদের দার্শনিক ভিত্তি।


