এডমন্ড উইলসন বলেছিলেন, সকালের নাশতার সময় তিনি একমাত্র মারকুই দ্য সাদের বই-ই পড়তে পারেন না। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন আমি সকালের চা ও টোস্টের সঙ্গে কাফকার লেখা পড়তে পারি না। অত বেশি যন্ত্রণা, ক্ষত-বর্ণনা, বিভ্রান্তি, স্যাডোম্যাসোকিজম, অকারণ নিষ্ঠুরতা, আর ইঁদুর, পোকামাকড়, শকুনের মতো বিচিত্র জীবের আবির্ভাব—সব মিলিয়ে এক গভীর হতাশার পটভূমি তৈরি করে কাফকা, যা সকালটা বিষণ্ন করে তোলে।আর রাতের ঘুমের আগে তো কথাই নেই, কাফকা মোটেও সান্ত্বনাদায়ক পাঠ নয়।
হাইপোকন্ড্রিয়াক, অনিদ্রাগ্রস্ত, খাদ্যসংকীর্ণ, সিদ্ধান্তহীন, জীবনের ভয়ে ভীত, এবং মৃত্যু নিয়ে সারাক্ষণ ভাবত কাফকা, তাঁর স্নায়বিক দুর্বলতাগুলোকেই শিল্পে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। আইজাক বাসেভিস সিঙ্গারের একটি গল্পে একজন চরিত্র বলেছে, কাফকা ছিল “হোমো স্যাপিয়েন্সের আত্ম-নির্যাতনের সর্বোচ্চ রূপ।” তবুও আজ সবাই একমত যে কাফকা একজন আধুনিক মাস্টার, এমন একজন শিল্পী যিনি জেমস জয়েস, পিকাসো, স্ট্রাভিনস্কি বা মালার্মের মতো আধুনিকতার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন।
এরিখ হেলার লিখেছিলেন, কাফকা তৈরি করেছেন “অন্ধকার স্বচ্ছতা”, একটি শিল্প যেখানে জিনিসপত্র যেন পরিষ্কার, অথচ বোধগম্য নয়। আমরা ভাবি বুঝেছি, কিন্তু কি সত্যিই বুঝেছি? তার একটি বিখ্যাত উক্তি: “লুকানোর জায়গা অসংখ্য, পালানোর পথ একটি, কিন্তু পালানোর সম্ভাবনা আছে যতটা লুকানোর জায়গা আছে।” আরেকটা “একটি খাঁচা খুঁজছিল একটি পাখিকে।” কাফকার ছোট ছোট রূপক-গল্প নিয়েও বিশ্লেষণ থামে না।
ওয়াল্টার বেঞ্জামিন লিখেছিলেন, কাফকার রচনাগুলো “কখনোই ব্যাখ্যার মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় না; বরং তিনি ব্যাখ্যা প্রতিরোধের জন্যই সব রকম সাবধানতা অবলম্বন করতেন।” তবুও সেই সাবধানতা ফলপ্রসূ হয়নি। শেক্সপিয়ার ও বাইবেলের পর কাফকার লেখাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যাখ্যাত এবং হয়তো অতিরিক্ত ব্যাখ্যাত।
২০১২ সালে টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্ট পত্রিকায় গ্যাব্রিয়েল যসিপোভিচি কাফকার ওপর বেশ কিছু বইয়ের আলোচনা করেন। তার মধ্যে ইতিহাসবিদ সল ফ্রিডল্যান্ডারের লেখা Franz Kafka: The Poet of Shame and Guilt একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ইতিহাসবিদ হলেও, কাফকার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক। দুজনই জার্মানভাষী ইহুদি এবং প্রাগে বেড়ে ওঠা। কাফকা যেভাবে নাৎসি শিবিরে তিন বোনকে হারিয়েছিলেন, ফ্রিডল্যান্ডারও নিজের মা-বাবাকে হারিয়েছিলেন ।
ফ্রিডল্যান্ডার বুঝেন কাফকাকে নিয়ে কত রকম ব্যাখ্যা চালু আছে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি হলো—“কাফকা ছিল নিজের ভেতরের বিশৃঙ্খলার কবি।” যদিও তিনি সরাসরি বলেননি, তবুও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে কাফকা হয়তো চেপে রাখা সমকামী ছিলেন এবং তাঁর লজ্জা ও অপরাধবোধ মূলত সেখান থেকেই। যদিও এক পর্যায়ে নিজেই লেখেন, “সম্ভবত কাফকা কখনো সমকামী সম্পর্কে চিন্তাও করেননি।” তবুও কাফকার রচনায় তিনি এমন গোপন সত্য খুঁজে পান যা চরিত্ররা লুকাতে চায়। “একটা কিছু আছে যা গোপন এবং যা সে লুকাতে চেষ্টা করে—এটা কি কাফকার নিজের যৌন প্রবণতা লুকানোর চেষ্টা নয়?”
তিনি কাফকার তরুণ বয়সে ছেলে বন্ধুদের প্রতি “হোমোইরোটিক” ঝোঁকের কথা উল্লেখ করেন, আবার বলেন কাফকার নারীদের চিত্রায়ন প্রায় অমানবিক।এমনকি “A Country Doctor” গল্পে এক শিশুর ঘায়ের মধ্যে কীটের ওলটানো প্রতীক হিসাবে যোনির ইঙ্গিতও টানেন। সমালোচকেরা নিরবিচারে ঘুমালেও, সমালোচনার পাহারা চলে।
কাফকা নাকি প্রুস্তের মতো দীপ্তিমান নন, জয়েসের মতো উদ্ভাবক নন তবুও, জেরেমি অ্যাডলারের মতে, কাফকার দৃষ্টিভঙ্গি বেশি তীব্র, বেদনাদায়ক এবং সার্বজনীন। কাফকা শহরের নাম দেননি, চরিত্রের চেহারা বর্ণনা করেননি, তার গল্পের প্রেক্ষাপট যেন দুঃস্বপ্নের মতো আবছা, এটি এক ধরণের সাধারণতা থেকে বিস্তারিতের দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়া।
এরিখ হেলার বলেছিলেন, কাফকার সাহিত্য ও আত্মজীবনী প্রায় এক হয়ে গেছে। কাফকার জীবনের চিত্র, অপ্রসন্নতা, সন্দেহ, মানসিক যন্ত্রণা সবারই জানা। তাঁর বিখ্যাত চিঠি Letter to His Father এ জানা যায়, বাবা ছিলেন শক্তিধর ও কর্তৃত্ববাদী, যিনি ছেলের মনে জন্ম দিয়েছিলেন চিরস্থায়ী অযোগ্যতার অনুভব। তাঁর সরকারি চাকরিটিও তাঁকে এনে দিয়েছিল সেই দুর্বোধ্য, দুঃস্বপ্নময় আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা, যাকে আজ “Kafkaesque” বলা হয়।
“The Metamorphosis” বা “The Judgment” এর মতো গল্পে কাফকার সেই পিতৃপ্রভুত্ব ফিরে ফিরে আসে। “In the Penal Colony” বা “The Trial”-এ অপরাধহীন মানুষদেরও সাজা পেতে হয় ব্যাখাহীনভাবে। এমন সব গল্পের মধ্য দিয়ে কাফকা তুলে ধরেন অন্তঃসারশূন্য এক জীবনের দুঃস্বপ্ন যেখানে যুক্তি পরাজিত, অপরাধ অজানা, আর শাস্তি অবশ্যম্ভাবী।
লুইস বেগলি বলেন, কাফকা “মানব অবস্থান” লিখেছেন নিয়ে। হেলার বলেন, কাফকা সময়ের বাস্তবতাকে অতিক্রম করে গেছেন। কিন্তু তারা কেউই বলেন না, কীভাবে?
ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের মতে, কাফকার লেখা এক ধরণের সংকেত যার কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই, বরং প্রতিটি রচনায় তা বদলায়। কাফকা নিজেই বলেছিলেন, তাঁর প্রতিভা ছিল “স্বপ্নময় অন্তর্জীবন চিত্রায়নে।” কিন্তু স্বপ্ন, যতই মোহময় হোক, শিল্পগতভাবে অপূর্ণ লাগে বিশেষ করে তাদের শেষ অংশে। কাফকাও “The Metamorphosis” এর শেষ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। হয়তো সেই কারণেই তাঁর উপন্যাসগুলো অসম্পূর্ণ থেকে গেছে, দুঃস্বপ্নের তো কোনও ঠিকঠাক উপসংহার হয় না।
অবশ্য কাফকার গল্পগুলো নিঃসন্দেহে নিরানন্দ হলেও, মাঝে মাঝে তাতে অদ্ভুত হাস্যরসের ছোঁয়াও থাকে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়া, বাসায় বল নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ব্যাচেলর গভীর শূন্যতার মধ্যে একরকম উদ্ভটতা। কাফকা একবার The Trial এর প্রথম অধ্যায় পড়ে শুনিয়ে নিজেই হেসেছিলেন। কিন্তু সেই হাসি থাকে না; পাঠকের মনে রয়ে যায় ভয়, বিভ্রান্তি, শূন্যতা।
আজকের দুনিয়ায় অনেকে কাফকাকে এক ধরণের ভবিষ্যৎবক্তা ভাবেন, যিনি পূর্বাভাস দিয়েছিলেন স্বৈরশাসনের, বিশেষ করে সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের।কিন্তু তাঁর গল্পগুলোতে পিতৃআক্রান্ততা আর ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের গন্ধ আজ অনেকের কাছেই অচল। কাফকা নিজেই বলেছিলেন, “The Judgment” লেখার সময় তিনি ফ্রয়েডকে নিয়ে ভাবছিলেন। তাঁর গল্পে স্বপ্ন ও অচেতন মন সবই সেই সময়ের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন।
আজ ফ্রয়েডের ভাবনা ভেঙে পড়েছে, কিন্তু কাফকা এখনো টিকে আছে। প্রশ্ন হলো ফ্রয়েড ছাড়া কাফকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? অনেকে বলেন, কাফকাকে বিশ্লেষণ না করে শুধু অনুভব করতে হয়। কিন্তু যদি সেই অনুভব আজকের যুগে যথেষ্ট না হয়? শেষ কথায় ফিরে যাই, হেনরি জেমস বলেছিলেন, কোনো লেখকের সম্পর্কে আমরা জানতে চাই: “সে জীবনের প্রতি কী অনুভব রাখে?” কাফকার উত্তর জীবন জটিল, ভীতিকর, বিষণ্ন। কিন্তু একজন মহান লেখক তো জীবনের রহস্যে মোহিত হন; কাফকা, বরং, সেগুলোতে পিষ্ট হয়েছিলেন।


