ফ্রান্স এবং আমেরিকার সম্পর্ক ইতিমধ্যে অনেক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে, আর তা আরও জটিল হতে পারে যদি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমমানুয়েল ম্যাক্রনের স্ত্রীকে নিয়ে চলা গুজবগুলির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি ডানপন্থী আমেরিকান মন্তব্যকারীরা একটি অযৌক্তিক এবং মিথ্যা গুজব ছড়িয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট পত্নী ব্রিজিট ম্যাক্রন আসলে পুরুষ ছিলেন এবং তিনি ট্রান্সজেন্ডার হয়ে তার পুরুষ পরিচয় গোপন রেখেছেন। এই গুজবটি দুই প্রধান ট্রাম্প-সমর্থক কনজারভেটিভব্যক্তি, ক্যান্ডেস এবং কার্লসন দ্বারা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভিডিওর মাধ্যমে তারা এই তত্ত্বটি প্রচার করেছেন।
ক্যান্ডেস তার ইউটিউব চ্যানেলে প্রথমে এই গুজবটি প্রচার করেন এবং এটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তিনি একটি ভিডিও পোস্ট করেন যার শিরোনাম ছিল “ফ্রান্সের প্রথম মহিলা কি পুরুষ?” এবং এতে দাবি করেন যে ব্রিজিট ম্যাক্রন আসলে একজন পুরুষ। তিনি এক্স’এ এই ভিডিওটি প্রচার করে লেখেন, “আপনারা সবকিছু থামিয়ে এখন এটিই দেখুন! এটা কোনো রসিকতা নয়, এটি মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি!” তার এই দাবির পর এটি ট্রাম্পের মাগা আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং গুজবটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এই গুজবের মূল উৎস ছিল ২০২১ সালে ফরাসি ডানপন্থী জার্নাল “ফেত ও ডকুমেন্টস”-এ প্রকাশিত একটি আর্টিকেল, যেখানে বলা হয়েছিল ব্রিজিট এবং তার ভাই জঁ-মিশেল ট্রগনিও আসলে এক ব্যক্তিই ছিলেন। ওই আর্টিকেলে দাবি করা হয়েছিল যে, ব্রিজিট নিজেই জঁ-মিশেল ছিলেন এবং তিনি ৩০ বছর বয়সে পুরুষ থেকে নারী হয়ে ওঠেন। ক্যান্ডেস সেই আর্টিকেলটিকে উল্লেখ করে বলেন, “আমি পেশাদারী খ্যাতির উপর বাজি ধরতে পারি যে ব্রিজিট আসলে একজন পুরুষ। যে সাংবাদিক বা প্রকাশনা যারা এই দাবিকে অস্বীকার করছে, তারা প্রতারক প্রতিষ্ঠানেরই অংশ।”
তারপর থেকে ক্যান্ডেস এ নিয়ে তার ইউটিউব চ্যানেলে একাধিক ভিডিও পোস্ট করেছেন, যার মধ্যে “বিকামিং ব্রিজিট” নামক একটি সিরিজও রয়েছে। এই সিরিজটি ব্রিজিট ম্যাক্রন সম্পর্কিত তার দাবি আরও বেশি প্রচারিত করেছে এবং ভিডিওর ভিউ সংখ্যা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে পিয়ার্স মর্গান এই দাবি সম্পর্কে ক্যান্ডেস-এর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই ধরনের দাবি অত্যন্ত আপত্তিকর এবং ভুল। একসময় তিনি ক্যান্ডেস-কে ১০০,০০০ ডলার দান করার প্রস্তাব দেন, যদি তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে ব্রিজিট ম্যাক্রন একজন পুরুষ নন। তবে ক্যান্ডেস সব সমালোচনা উপেক্ষা করে তার প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে এবং নিয়মিত তার ভিডিও সিরিজের মাধ্যমে নতুন নতুন তথ্য এবং সাক্ষাৎকার প্রকাশ করছেন।
প্রেসিডেন্ট এমমানুয়েল ম্যাক্রন এই গুজব সম্পর্কে মন্তব্য করেন, “সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হল মিথ্যা তথ্য এবং তৈরি করা দৃশ্যকল্প। মানুষ এসব বিশ্বাস করে এবং আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও বিঘ্ন সৃষ্টি করে।” এছাড়াও ব্রিজিট ম্যাক্রনের মেয়ে টিফেন এই গুজবগুলিকে “অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিক” এবং “হয়রানি” হিসেবে মন্তব্য করেন। ফরাসি প্রথম পরিবার এই গুজবের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তারা একটি মানহানি মামলা দায়ের করে, যার ফলে ক্যান্ডেস এবং তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়। এই মামলা এবং এর ফলস্বরূপ গুজবটির আরও প্রসারিত হওয়া নিশ্চিত করেছে। এছাড়া রাশিয়ান রাষ্ট্রীয় মিডিয়াগুলো ক্যান্ডেস-এর ভিডিগুলো প্রচার করছে, এটা যেন তার জন্য আরও বিশেষ অর্জন হয়ে উঠেছে। এক ভিডিওতে বলেন, “আমি বুঝতে পারিনি যে, আমার নাম রুশ ভাষায় কতটা চমৎকার শোনাচ্ছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক স্যান্ডার ভ্যান ডার লিন্ডেন বলেন, বর্তমান সময়ে মিডিয়া পরিবেশে গুজব এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সুতরাং মানুষ বিভিন্ন মিডিয়া চ্যানেলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং যেসব তথ্য তারা বিশ্বাস করে সেগুলো অপরের থেকে আলাদা হতে থাকে, এতে গুজব এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলির প্রসারে সহায়ক হয়। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ জোসেফ ইউসিনস্কি মন্তব্য করেন, ক্যান্ডেস এবং কার্লসন-এর মতো ব্যক্তিত্বরা নিজেদের গুজবপ্রিয় দর্শকদের জন্য এমন বিষয় নির্বাচন করেন যা তাদের বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তারা এমন কনটেন্ট তৈরি করেন যেগুলো এক শ্রেণীর দর্শকদের আশার সাথে মানানসই হয়ে যায়। এই গুজবটিও মূলত এমন একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যেখানে ক্ষমতাশালী নেতারা নিজেদের প্রকৃত চরিত্র লুকিয়ে রাখেন এবং এমন সব লিঙ্গ রাজনীতি নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা হয়।
মিথ্যা হলেও ব্রিজিট ম্যাক্রন-এর ট্রান্সজেন্ডার হওয়া সম্পর্কে গুজবটি এক বৃহত্তর রাজনৈতিক বিবেচনায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স এবং আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে ইতিমধ্যে যেসব সংকট তৈরি হয়েছে, এই গুজবটি সেই সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।বিশেষত যদি এটি ট্রাম্প সমর্থকদের দ্বারা সমর্থিত হয়, তবে তা ফ্রান্স এবং আমেরিকার মধ্যে আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই গুজবের ফলস্বরূপ শুধুমাত্র রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও একটি বিভাজন সৃষ্টি হবে, যেটি বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা আরো উস্কে দিতে পারে।


