১৯৭২ সালের টরন্টোর অন্টারিওতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পারাসাইকোলজির পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় এবং বিতর্কিত পরীক্ষাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই পরীক্ষার নাম ছিল ‘ফিলিপ পরীক্ষা’। এটি মানুষ নিজের ইচ্ছার দ্বারা একটি কাল্পনিক ভূত তৈরি করতে পারে এবং সেই ভূতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হতে পারে ধরণের ধারণার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত হয়েছিল। এটি ছিল মানব মনের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা এবং বিশ্বাসের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা একটি কাল্পনিক ভূত তৈরি করে তাকে সনাক্ত এবং সেই ভূতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন।
টরন্টোতে যখন পরীক্ষাটি শুরু হয়, তখন একটি দল পারাপসাইকোলজি গবেষক এবং যুক্ত বিজ্ঞানে আগ্রহী মানুষরা মিলে একটি নতুন পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করে। তাদের লক্ষ্য ছিল অতিপ্রাকৃত জীবনের ধারণাকে পরীক্ষায় ফেলে দেখা। সেখানে মূল বিষয় ছিল, মানুষ কি একটি কাল্পনিক ভূত সৃষ্টি করতে পারে যা সত্যিকারভাবে ‘আত্মা’ হিসাবে আচরণ করবে এবং তারা কি এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হবে? এই দলের সদস্যরা ফিলিপ নামে একটি ভূতের চরিত্র তৈরি করেছিলেন। এই ভূতটি সম্পূর্ণভাবে কাল্পনিক ছিল অর্থাৎ একেবারে মনের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিল। ভূতটির একটি বিস্তারিত পটভূমি ছিল, যার মধ্যে তার জীবনের ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, এবং মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল তারও বর্ণনা ছিল। দলটি সিদ্ধান্ত নেয় যে এই ভূতটির সঙ্গে তারা যোগাযোগ করবে।
পরীক্ষা শুরু হয়েছিল একটি সাদা বোর্ডে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখত। তারা একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে, নির্দিষ্ট এক জায়গায় বসে এবং ভূতের উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করত। শুরুতে কিছুটা জল্পনা চললেও কিছু সময় পরেই তারা অবাক হয়ে দেখতে পায় যে কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। প্রথমদিকে দলটি তাদের মনের মাধ্যমে ভূতের উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করে। শুরুতে ভূতটির নাম ধরে ডাকতে থাকে এবং তার ইতিহাসের নানা দিক আলোচনা করে। আস্তে আস্তে তারা অনুভব করতে থাকে যে ‘ফিলিপ’ নামে এই ভূত তাদের কাছে উপস্থিত। এর পরবর্তী ধাপে তারা ভূতটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন আধ্যাত্মিক মাধ্যম যেমন সেশনের কাজ করতে শুরু করে।
এই পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছু দিন পরেই, অংশগ্রহণকারীরা এমন কিছু অবাক করা ঘটনা দেখতে শুরু করে যা তাদের ধারণা করেছিল যে এটি কোন প্রাকৃতিক বা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার বাইরে কিছু। প্রথমে তারা একে নিছক অভ্যন্তরীণ অশান্তি এবং গোষ্ঠীজ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তবে কিছু সময় পরেই তারা দেখল যে ভূতটির উপস্থিতি ছিল অনস্বীকার্য এবং সে তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। ভূতটি একসময় তাদের প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট এবং যুক্তিযুক্ত উত্তর দিতে শুরু করে। তাদের মতে, ফিলিপ ভূতটি তার সৃষ্টিকর্তাদের সামনে বেশ কিছু চমকপ্রদ এবং রহস্যজনক তথ্য প্রকাশ করেছিল, যা তারা কখনও কল্পনাও করেননি। এই পরীক্ষার মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছিল যে, একটি কাল্পনিক ধারণা বাস্তবে পরিণত হতে পারে, যদি তার প্রতি বিশ্বাস এবং মনোযোগ যথেষ্ট পরিমাণে দেওয়া হয়।
ফিলিপ পরীক্ষাটি পারাপসাইকোলজি এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহী মানুষের মধ্যে একেবারে বিতর্কের সৃষ্টি করে। যদিও এটি বেশ কিছু প্রমাণ প্রদর্শন করেছে যে মানুষ তাদের মনের শক্তি দিয়ে অদৃশ্য জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, তবে সমালোচকরা একে শুধুমাত্র মানসিক বিকৃতির ফলাফল বলে মনে করেছেন। তাদের মতে, দলটি একটি মনোস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া বা গ্রুপ সাইকোসিসের শিকার হয়েছিল, যেখানে তাদের নিজের কল্পনা এবং বিশ্বাস বাস্তবতাকে বিকৃত করে দিয়েছিল। অনেক গবেষক বিশ্বাস করেন যে ফিলিপ পরীক্ষা ছিল শুধুমাত্র এক ধরণের ‘গ্রুপ থিঙ্কিং’ (group thinking) যার মাধ্যমে একটি মিথ্যা ধারণা একটি দল পুরোপুরি বিশ্বাস করতে থাকে। যদিও এটি পারাপসাইকোলজি এবং আধ্যাত্মিকতার সাথে সম্পর্কিত বিশাল প্রশ্ন তুলে ধরেছিল, তবে এটি পুরোপুরি প্রমাণ করতে পারেনি যে অতিপ্রাকৃত পৃথিবীর অস্তিত্ব রয়েছে।
ফিলিপ পরীক্ষা আজও একটি অন্যতম বিতর্কিত এবং গুরুত্বপূর্ণ পরপার্থক্য পরীক্ষার অংশ। এটি প্রমাণ করেছে যে মানুষের মন এতটাই শক্তিশালী যে সে নিজের ইচ্ছার দ্বারা এমন কিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম, যা বাস্তব বলে মনে হতে পারে। এটি আমাদের মন এবং বিশ্বাসের প্রকৃতি সম্পর্কে আরো অনেক কিছু শিখিয়েছে, যদিও এখনও এই বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয়নি যে অতিপ্রাকৃত কিছু আমাদের চারপাশে সত্যিই বিদ্যমান। ফিলিপ পরীক্ষা মানব মনের ক্ষমতা, বিশ্বাস এবং অতিপ্রাকৃত জগতের সম্পর্কের ওপর এক গভীর আলোচনার সূচনা করেছে, এবং আজও এটি পারাপসাইকোলজি ও আধ্যাত্মিক গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়।


