১৮৩৯ সালে যখন ফটোগ্রাফি প্রথম বাজারে আসে তখন অনেক শিল্পী আঁতকে উঠেছিলেন। পল ডেলারোশ তখনই ঘোষণা দিলেন, “আজ থেকে চিত্রকলা মৃত!” কারণ ফটোগ্রাফি মানেই বাস্তবতার নিখুঁত অনুলিপি। একটা যন্ত্র চোখের মতো দেখে, আর রঙতুলির চেয়েও নিখুঁতভাবে ক্যানভাসে চেপে দেয় বাস্তবকে। তখনকার শিল্পীরা ভাবলেন, শিল্পের জায়গাটা বুঝি এবার যন্ত্র নেবে! কিন্তু সত্যিই কি তাই ঘটেছিল?
এই প্রশ্নই আজ আবার ফিরে এসেছে AI (Artificial Intelligence) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির হাত ধরে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, AI কি শিল্প সৃষ্টি করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ইতিহাসে। ঠিক সেই জায়গায় যেখানে ফটোগ্রাফিকে শিল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল বা প্রতিহত করার চেষ্টা হয়েছিল।
ফটোগ্রাফির আগে বাস্তবকে অনুকরণ করা মানেই ছিল শিল্প। একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী কতটা নিখুঁতভাবে মানুষের মুখ বা প্রকৃতির দৃশ্য আঁকতে পারেন, সেটাই ছিল তাঁর গৌরব। বিশেষ করে ১৯শ শতকের ফরাসি নিও-ক্লাসিকিস্ট ও প্রি-রাফায়েলাইট শিল্পীরা চরম বাস্তবতাবাদে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফটোগ্রাফি যখন সেই বাস্তবকে যন্ত্রের মাধ্যমে ধরা শুরু করল, তখন চিত্রকলার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠল।
তখনকার শিল্পী ও কবিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। বোদলেয়ার, বলেছিলেন, “যদি ফটোগ্রাফিকে শিল্পে ঢুকতে দেওয়া হয়, তাহলে একদিন সে শিল্পকে ধ্বংস করে দেবে, কারণ সাধারণ মানুষের বোকামি তার সবচেয়ে বড় মিত্র।” অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করতেন, ফটোগ্রাফি হয়তো শিল্প নয়, কিন্তু শিল্পীদের রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগতে পারে। আবার একটি তৃতীয় দল ফটোগ্রাফিকে একটি নতুন ধারা হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, একটি যন্ত্রনির্ভর অথচ শিল্পসাধনার ক্ষেত্র।
কিভাবে ফটোগ্রাফি শিল্প হয়ে উঠল?
প্রথম দিকে ফটোগ্রাফি ছিল মূলত স্মৃতি ধরে রাখার মাধ্যম। ধনীরা আগে যেখানে প্রতিকৃতি আঁকাতেন, সাধারণ মানুষ তা পারত না। কিন্তু ড্যাগুয়েরোটাইপ প্রযুক্তি এলো আর স্বল্পমূল্যে যান্ত্রিক প্রতিকৃতি তৈরি সম্ভব হয়ে উঠল। এরপর পর্যটকরা প্রাচীন রোমান ধ্বংসাবশেষের ছবি নিতে লাগল, ইঞ্জিনিয়াররা নির্মাণকাজের নথিপত্র রাখতে লাগলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ধরা পড়তে লাগল ক্যামেরার লেন্সে। কিন্তু একটা সময়ের পর, প্রশ্ন উঠল এই যন্ত্রনির্ভর ছবি কি শিল্প? শিল্পের মধ্যে যদি থাকে মানুষের অনুভব, সৌন্দর্যবোধ, ইচ্ছাশক্তি, তাহলে কি যন্ত্রের তৈরি ছবি সেই সংজ্ঞায় পড়ে?
এই বিতর্ক থেকেই ফটোগ্রাফি-ভিত্তিক শিল্প আন্দোলনের জন্ম হয়। “Pictorialism” ও “Photo-Secession” আন্দোলন। এদের দাবি ছিল ছবিতে শিল্পীর নিয়ন্ত্রণ, কম্পোজিশন, আবহ all are artistic choices. আর তাই এসব ছবি শুধু তথ্য নয়, অনুভূতিও বহন করে। ১৯১০ সালে স্টিগলিটজ যখন আলব্রাইট গ্যালারিতে প্রথম ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী আয়োজন করলেন, তখন একপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলল যে ফটোগ্রাফিও এখন শিল্প।
ফটোগ্রাফির আগমন চিত্রকলাকে ধ্বংস করেনি, বরং নতুন পথ দেখিয়েছে। যদি ক্যামেরা বাস্তবকে অনুলিপি করতে পারে, তাহলে চিত্রশিল্পীর কাজ কী?এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিল নতুন ধারার চিত্রকলার ইমপ্রেশনিজম, টোনালিজম এবং পরবর্তীতে অ্যাবস্ট্রাকশন। শিল্পীরা বললেন, “আমরা শুধু বাইরে যা দেখি তা আঁকব না, আমরা যা অনুভব করি, যা স্বপ্ন দেখি, সেটাই দেখাব।”
ভ্যান গঘ তার ভাইকে লিখেছিলেন, “একটা আয়নায় বাস্তবতা ধরা পড়লে, সেটাকে আমরা ছবি বলি না, কারণ সেটা শুধু ছায়া। রঙ, রেখা, অতিরঞ্জন—এই সবকিছু মিলে একটা ছবি শিল্প হয়।” এইভাবে ফটোগ্রাফি পুরনো বাস্তববাদকে ভেঙে দিল, কিন্তু তার বদলে এক নতুন শিল্প-চেতনার জন্ম দিল। বলা যায় ফটোগ্রাফি না এলে হয়তো আধুনিক চিত্রকলাও আসত না।
আজকের দিনে আবার আমরা দাঁড়িয়েছি এক অনুরূপ সন্ধিক্ষণে। AI নির্মিত চিত্র তৈরি প্রযুক্তি, যেমন DALL·E বা Midjourney, দেখে অনেকে আতঙ্কিত হচ্ছেন এই যন্ত্রগুলো বুঝি শিল্পীদের চাকরি নিয়ে নেবে।
তবে ইতিহাস বলছে নতুন প্রযুক্তি শিল্পকে ধ্বংস করে না, বরং তাকে বিবর্তিত করে। Pixar প্রতিষ্ঠাতা আলভি রে স্মিথ বলেছিলেন, “কম্পিউটার শুধু একটা টুল। এটা নিজে থেকেই সৃজনশীল নয়।” আজও অ্যানিমেশন, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিজ্যুয়াল আর্ট সব জায়গায় কম্পিউটার আছে, কিন্তু তার পিছনে রয়েছে মানুষের মেধা, অভিজ্ঞতা ও কল্পনা।
AI-ও ঠিক সেইরকম এক মাধ্যম, এটা শুধু একটা টুল। একজন শিল্পী চাইলে এটাকে ব্যবহার করে নিজের চিন্তা আরও গভীরভাবে প্রকাশ করতে পারেন।তার ভিশন, আবেগ, স্টাইল AI-কে নির্ধারণ করবে। যেমন ফটোগ্রাফি একটা নতুন শিল্পের জন্ম দিয়েছিল, AI-ও দিচ্ছে তেমন নতুন এক সম্ভাবনার দরজা।
যখনই কোনো নতুন প্রযুক্তি আসে মানুষ ভয় পায়। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে সেই ভয়ই একটা নতুন শিল্প-বিপ্লবের জন্ম দেয়। শিল্প মানে কল্পনা, উদ্দেশ্য, এবং হৃদয়ের প্রকাশ। সেটাই থাকলে মাধ্যম বদলালেও শিল্প থেকে যায়। AI কি শিল্প সৃষ্টি করতে পারে? উত্তরটা সহজ নয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বলছে নতুন প্রযুক্তি শিল্পের পরিসর বাড়া সংকুচিত করে না। এখন শিল্পীদের দায়িত্ব, এই নতুন যন্ত্রকে আত্মস্থ করে ভবিষ্যতের শিল্পের ভাষা নির্মাণ করা।


