প্ল্যানচেট (Planchette) হচ্ছে সতেরো শতক থেকে বিশ শতকের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করা একটি ছোট, সমতল হার্ট শেপের কাঠ বা প্লাস্টিকের টুকরা, যা মূলত ‘ওইজা বোর্ড’ এর সঙ্গে ব্যবহৃত হয় আধ্যাত্মিক বা অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে। এটি বিশেষভাবে আধ্যাত্মিক আন্দোলন এবং অতিপ্রাকৃত ধারণার সাথে জড়িত। প্ল্যানচেটের ব্যবহার মূলত সেশনের মাধ্যমে আত্মা বা আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য, যার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা অক্ষর সংখ্যা বা বার্তা পড়তে বা লিখতে পারেন।
প্ল্যানচেটের ইতিহাস বেশ পুরনো। এর মূল ব্যবহার শুরু হয় ১৮৫০-এর দশকে, এটি প্রথমবারের মতো একটি খেলনা হিসেবে উদ্ভাবিত হয়েছিল। এক সময় মানুষ একে অপরকে অক্ষর বা সংখ্যা দেখানোর জন্য টুকরাটি ব্যবহার করত। তবে ১৮৫৩ সালে এক ফরাসি আবিষ্কারক এর ব্যবহারকে একটি নতুন আঙ্গিকে পরিণত করেন এবং এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক যোগাযোগের উপকরণ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ঐ সময় পশ্চিমা বিশ্বে আধ্যাত্মিক আন্দোলন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেখানে মানুষ মৃত আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করত। প্ল্যানচেটের ব্যবহার এই সময়কার এক গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক সরঞ্জাম হয়ে ওঠে, মানুষকে আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা দেখায়।
এতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন যে প্ল্যানচেটটি আত্মা বা আধ্যাত্মিক শক্তির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। যখন তারা এর ওপর আঙুল রাখে, তখন এটি যেন তাদের হাতে না গিয়ে এক অদৃশ্য শক্তি তাদের দিকে নির্দেশনা দেয়। এতে তারা বিশ্বাস করেন, আত্মারা তাদের প্রিয়জনদের বার্তা পৌঁছাতে বা কোনো তথ্য প্রদান করতে পারে। তবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি প্রাকৃতিক ঘটনা। প্ল্যানচেটের গতির পেছনে মানুষের অজান্তে থাকা পেশী শক্তির প্রভাব রয়েছে, যার কারণে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়। একে ইউক্লিডিয়ান আন্দোলন (Ideomotor Effect) বলা হয়, যেখানে ব্যক্তির অজান্তে তার শরীরের কোনো অংশ চালিত হয়ে থাকে।
বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি এবং দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্ল্যানচেটের প্রতি এক গভীর আগ্রহ এবং বিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে অতিপ্রাকৃত বা আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব। কথিত আছে, তিনি নিয়মিত সেশন করতেন এবং আত্মাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য প্ল্যানচেট ব্যবহার করতেন। তাঁর এই আধ্যাত্মিক অন্বেষণ
অনেকের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া আরও কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির প্ল্যানচেটের প্রতি বিশ্বাস বা আগ্রহ ছিল। আমেরিকান আইনজীবী ডেনিস হোপ প্ল্যানচেটের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপনের ব্যাপারে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তিনি বহুবার এই যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এটি আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
ফরাসি দার্শনিক এবং লেখক আলফ্রেড রেডি (Alfred Reddz) প্ল্যানচেট ব্যবহার করে একাধিকবার আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন এবং এটি তার আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিয়েছিল বলে দাবী করেছিলেন। তিনি মনে করতেন প্ল্যানচেটের মাধ্যমে বাস্তব দুনিয়ার এবং অতিপ্রাকৃত দুনিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন স্থাপন করা সম্ভব। এমন অনেক ঘটনার সাক্ষীও আছে, যেখানে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করার পর একে অপরকে বিপদে ফেলতে দেখা গেছে। যেমন, একটি স্কুলের হোস্টেলে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্ররা প্ল্যানচেট করতে গিয়েছিল। প্রথমবার তারা কোনো অঘটন দেখতে পাননি, কিন্তু পরদিন তাদের মধ্যে এক ছাত্রীর মৃতদেহ হোস্টেলের বাগান থেকে উদ্ধার হয় এবং আরও দুই ছাত্র অসুস্থ হয়ে আইসিইউতে ভর্তি হন।
এই ধরনের অভিজ্ঞতাগুলি প্রমাণ করে যে প্ল্যানচেট কেবল এক আধ্যাত্মিক বা অতিপ্রাকৃত যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি কিছু ক্ষেত্রে বিপদের কারণও হতে পারে। যদিও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর কোন ভিত্তি নেই। তবে মানব মন এবং বিশ্বাসের ক্ষমতা এমন কিছু ঘটনাকে সৃষ্টি করতে পারে যা সাধারণ মানুষের কাছে অলৌকিক বলে মনে হয়।


