তাও—চীনা ভাষায় যার অর্থ পথ। কিন্তু এই “পথ” কোনো রাস্তা নয়, এটি সেই অদৃশ্য ধারাবাহিকতা, যার উপর দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অস্তিত্ব গড়ে উঠেছে এবং যার ধ্যানে ডুবে আছে তাওবাদ। দেড় হাজার বছরের বেশি সময় আগে অশান্ত চীনের বুকে এক রহস্যময় জ্ঞানী, লাওৎসে রেখে গিয়েছিলেন ৫০০০ চিহ্নের একটি গীতিকবিতাময় গ্রন্থ। নাম তাও তে চিং। এই বইই তাওবাদের মূল, এবং সেইসঙ্গে মানবজগতের একটি আত্মিক প্রশ্নের নিরব প্রতিধ্বনি।খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর চীন ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ আর সামাজিক ভাঙনের সময়। কনফুসিয়াস যখন সমাজকে নৈতিক শৃঙ্খলায় বাঁধতে চাইছিলেন, তখন লাওৎসে বললেন—
“Everything is done.” এই “Wu Wei” ধারণা তখনকার কঠোর সামাজিক কাঠামোর বিপরীতে এক বিপ্লব। তাওবাদ বলল তুমি কিছু না করেই থাকো, প্রকৃতির সঙ্গে সুর মিলাও। এ দর্শনের জন্মই যেন ছিল ক্ষমতা ও কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে একটি নিরব প্রতিরোধ। তাওবাদ বিশ্বাস করে জগতের সবকিছুই একটি ধ্রুব প্রবাহের অংশ। এই প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে বিভ্রান্তি জন্মায়। তাই ‘Wu Wei’ মানে আসলে নির্জীবতা নয়, বরং এমন কাজ যা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়। এই ভাবনার সঙ্গেই জড়িয়ে আলোর মধ্যে অন্ধকার, অন্ধকারে আলোর বীজ। বিপরীতের মধ্যেই ভারসাম্য।
তাওবাদ এবং উপনিষদীয় দর্শনের মধ্যে রয়েছে চমৎকার সাদৃশ্য। উপনিষদ বলে “তৎ ত্বম আসি” মানে তুমিই সেই ব্রহ্ম। তাওবাদ বলে—তুমিই তাও।অন্যদিকে বৌদ্ধ দর্শনের শূন্যতা ও তাওবাদের নিরাকার তাও অনেকটা অভিন্ন, যেখানে অস্তিত্ব মূলত অস্ফুট, নিরব ও পরিবর্তনশীল।
এমনকি আধুনিক দর্শনে Nietzsche-এর “Will to Power” যেখানে শক্তির উদ্দীপনায় আত্মপ্রতিষ্ঠা ঘটে, তাওবাদ সেখানেও বলে—“ছায়া হও, দীপ্তি নয়; নরম হও, কঠিন নয়”। দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এক অলঙ্ঘনীয় দূরত্ব থেকেও এক অদ্ভুত প্রতিস্পর্ধা রয়েছে। তাওবাদ শুধু দর্শন নয়, চীনের ঐতিহ্যিক চিকিৎসাবিদ্যা, মার্শাল আর্টস, স্থাপত্য, এমনকি পরিবেশনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্সে যখন বলা হয় কণিকা ও তরঙ্গ একসাথে থাকে, বা পর্যবেক্ষণ করলেই বাস্তবতা বদলায়, তখন তাও যেন Tao-র মতোই অদৃশ্য শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়।
System Theory বা Cybernetics-এ “Self-Organizing Systems”-এর ধারণা তাওবাদী Wu Wei-র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—নিয়ন্ত্রণ নয়, বিকাশকে জায়গা করে দাও। এমনকি বর্তমানের ইকো-থেরাপি বা জাপানি Forest Bathing-এর ধারণাও Tao-র নৈঃশব্দ্য ও প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার পথেই গড়ে ওঠা।
স্টোয়িক দর্শন বলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করো, নিয়তির মুখোমুখি হও। তাওবাদ বলে, আবেগ বর্জন নয়, বরং আবেগের স্রোতে ভেসে চলাই জীবনচর্চা ।স্টোয়িকরা নিজেদের শাসন করে প্রকৃতি জয় করতে চায়। Taoists নিজেদের বিলিয়ে দেয় প্রকৃতির বুকে। তফাতটা এক আত্মার সুর আর শরীরের ছায়ার মতো। তাওবাদ আমাদের শেখায় জীবনের প্রতিটি কিছুর মধ্যে একধরনের ছন্দ আছে। তুমি যখন জোর করে সেই ছন্দ বদলাতে চাও, তখনই ক্লান্তি, অবসাদ, ও অহম দেখা দেয়। তাওবাদের দৃষ্টিতে আমরা কেউই আসলে আলাদা নই, সবকিছুই এক প্রবাহের অংশ, আর আমরা কেবল সেই নদীর একটি ঢেউ।
“Nature does not hurry, yet everything is accomplished.” — লাওৎসে । আজকের দুনিয়ায় যেখানে প্রতিদিন আমাদের উপর দ্রুত সিদ্ধান্ত, সাফল্য আর নিয়ন্ত্রণের চাপ পড়ে সেখানে তাওবাদ একটা বিপরীত দিক নির্দেশ করে। একটি নরম, অনুচ্চারিত আহ্বান— “তুমি যা করছো তা বন্ধ করো না, শুধু তা নিয়ে লড়াই করে তোমাকেই শেষ করে দিও না যেন।”


