মানুষ কি সত্যিই মৃত্যুর চিন্তা ছাড়াই বছরের পর বছর বাঁচতে পারবে? যুগে যুগে অমরত্বের ধারণা নিয়ে অনেক তত্ত্ব ও কল্পনা গড়ে উঠেছে। তবে গুগলের সাবেক প্রকৌশলী রে কুর্জওয়েলের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হলে হয়তো আমরা সেই ভবিষ্যতের দোরগোড়ায় প্রায় পৌঁছে গেছি। সম্প্রতি রে কুর্জওয়েল দাবি করেছেন, মাত্র ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষ অমরত্ব অর্জন করতে পারবে। তাঁর অতীতের বেশিরভাগ ভবিষ্যদ্বাণীই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাঁর করা ১৪৭টি ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশই সত্যি হয়েছে বলে জানা গেছে। ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল মেডেল অব টেকনোলজি’ পুরস্কারপ্রাপ্ত এই কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং প্রাক্তন গুগল প্রকৌশলী দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা করছেন।
২০০৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বই The Singularity Is Near-এ কুর্জওয়েল দাবি করেছিলেন যে ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন জেনেটিকস, ন্যানোটেকনোলজি ও রোবটিক্সের অগ্রগতি মানুষের বার্ধক্য প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। সম্প্রতি ইউটিউব চ্যানেল Adagio বইটির একটি অংশ নিয়ে আলোচনা করে, ফলে কুর্জওয়েলের এই পুরনো ভবিষ্যদ্বাণী আবার নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ২০১৭ সালে Futurism-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কুর্জওয়েল বলেছিলেন, ২০২৯ সাল হবে সেই বছর যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রথমবারের মতো একটি বৈধ টুরিং টেস্ট পাস করবে এবং মানব-সমতুল্য বুদ্ধিমত্তা অর্জন করবে।
তিনি আরও বলেন ২০৪৫ সালের মধ্যে সিঙ্গুলারিটি অর্জিত হবে, যখন মানব বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সঙ্গে একীভূত হয়ে এক বিলিয়ন গুণ বৃদ্ধি পাবে। কুর্জওয়েলের মতে, ন্যানো প্রযুক্তি এবং রোবোটিক্সই হবে এই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। তিনি বিশ্বাস করেন ভবিষ্যতে ন্যানোবট বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রোবট তৈরি করা সম্ভব হবে, যেগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করে কোষ ও টিস্যুগুলোকে পুনরুদ্ধার করবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেহে কোষ নষ্ট হতে থাকে, কিন্তু এই ন্যানোবটগুলো সেই নষ্ট কোষগুলোকে সারিয়ে তুলবে।ফলে বার্ধক্যজনিত রোগসহ অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে, যেটিই কার্যত স্যাপিয়েন্সকে অমরত্ব দান করবে।
এই ধারণাটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও, কুর্জওয়েল বিশ্বাস করেন প্রযুক্তির বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় এটি বাস্তবে পরিণত হতে পারে। তাঁর মতে আমরা ইতোমধ্যে এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, যেখানে মানবদেহের জেনেটিক প্রকৌশল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংমিশ্রণে বার্ধক্য প্রতিরোধ করা সম্ভব। সাধারণভাবে সিঙ্গুলারিটি বলতে সেই সময়কে বোঝানো হয় যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে মানুষ এবং মেশিনের মধ্যে পার্থক্য মুছে যাবে। তখন মানব সভ্যতা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে।
শুধু কুর্জওয়েল নন, অন্যান্য প্রযুক্তিবিদরাও এই ধারণার পক্ষে মত দিয়েছেন। জাপানের বিখ্যাত সফটব্যাংকের সিইও মাসায়োশি সন ২০১৭ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ২০৪৭ সালের মধ্যে সুপার ইন্টেলিজেন্ট মেশিন বা অতিমাত্রায় বুদ্ধিমান যন্ত্রের অভ্যুদয় ঘটবে। মাসায়োশি মনে করেন, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে রোবটরা স্ব-শিক্ষায় দক্ষ হয়ে উঠবে। তারপর হয়তো স্বয়ং আমাদেরকেই নিয়ে হাসাহাসি করবে। ইতোমধ্যে সফটব্যাংক রোবোটিক্স বিভাগ Pepper নামের একটি সেমি-হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করেছে, যেগুলো মানুষের আবেগ বুঝতে সক্ষম।
এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব যদি সত্যি হয়, তাহলে মানবজাতির ভবিষ্যৎ এক নতুন মাত্রায় পৌঁছাবে। আমরা কি তখন পুরোপুরি প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে যাব? আমরা কি শরীরের পরিবর্তে কেবল চেতনা হিসেবেই টিকে থাকব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা।তবে বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে মানুষ ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণই আমাদের অস্তিত্বের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে। যদি সত্যিই মানুষ বার্ধক্য প্রতিরোধ করে চিরকাল বেঁচে থাকতে পারে, তাহলে সেটি কতটা আশীর্বাদ আর কতটা অভিশাপ হবে? জীবনের একটি স্বাভাবিক নিয়ম হলো জন্ম, বেঁচে থাকা এবং মৃত্যু। এই নিয়ম ভেঙে গেলে সমাজে কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা এখনো অজানা।
আবার অন্যদিকে চিরকাল বেঁচে থাকার ফলে পৃথিবীর সম্পদের উপর চাপ বাড়বে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবেশগত সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তবে কিছু বিজ্ঞানীর মতে, এই সমস্যাগুলোরও সমাধান প্রযুক্তির হাত ধরেই সম্ভব হবে। রে কুর্জওয়েলের ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি হলে মানব সভ্যতা এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এটি কতটা বাস্তবসম্মত এবং আদৌ এটি মানবজাতির জন্য কল্যাণকর হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। বর্তমানে প্রযুক্তির অগ্রগতি দেখে এটুকু বলা যায় যে ভবিষ্যতে মানুষের জীবনযাত্রায় বিরাট পরিবর্তন আসতে চলেছে। অমরত্ব সত্যি হলে তা কি মানবজীবনকে আরও উন্নত করবে, নাকি তা এক নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। ভবিষ্যৎ যে দিকেই যাক না কেন, তা এখনো অনিশ্চিত।


