প্রমাণ ছাড়া এসব গ্রেপ্তার থামাতেই হবে : ডেভিড বার্গম্যান, সাংবাদিক

“জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী ও বর্তমানে ব্যবসায়ী শমী কায়সার কারাবন্দী আছেন ৬ মাস ধরে। সাংবাদিক দম্পতি ফারজানা রুপা ও শাকিল আহমেদ ৮ মাস, সাবেক সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর ৭ মাস; লেখক ও নির্মূল কমিটির সাবেক নেতা শাহরিয়ার কবির ৮ মাস আর জ্যেষ্ঠ সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত ৭ মাস ধরে কারাবন্দী।…সম্প্রতি একই ধরনের মামলায় আটক হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সাবেক সংসদ সদস্য সংগীতশিল্পী মমতাজ।

… তাঁদের সবাইকে একটি নির্দিষ্ট গোলাগুলির ঘটনায় হত্যা বা হত্যাচেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তবে এই অভিযোগের পক্ষে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে, এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। তাঁদের গ্রেপ্তারের ভিত্তি হচ্ছে, ওই সময় আহত বা নিহত ব্যক্তিদের স্বজনের দায়ের করা এফআইআর (প্রথম তথ্য প্রতিবেদন)। এই এফআইআরে অভিযোগ তোলা হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা বা ওই গোলাগুলির জন্য অর্থ জোগান দেওয়া কিংবা তা উসকে দেওয়ার কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

পুলিশ গ্রেপ্তারের আগে কোনো ধরনের তদন্তের চেষ্টা পর্যন্ত করেনি। দীর্ঘ কয়েক মাস আটক রাখার পরও এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ আদালতে এমন কোনো নতুন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি, যা এই নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সঙ্গে তাঁদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে।

ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা আদালত, এমনকি উচ্চ আদালতেও— প্রতিটি স্তরে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ও আইনজীবীরা জামিনের বিরোধিতা করেছেন।আদালতগুলোও প্রমাণের অভাব উপেক্ষা করে এই আটকাদেশগুলো বারবার বহাল রেখেছেন। যেখানে উচ্চ আদালত সাময়িক জামিন দিয়েছেন, সেখানে অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর সুপ্রিম কোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ চেয়েছে ও তা পেয়েছেও।

… বিচারব্যবস্থা যেন এমন সব মানুষকে দীর্ঘদিন কারাগারে পড়ে থাকতে দিতে অস্বস্তি বোধ করছে না। এসব মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বয়োবৃদ্ধ এবং গুরুতর অসুস্থ, তাঁরাও জামিন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। … দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব অনিয়ম নিয়ে নাগরিক সমাজ ও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো অস্বস্তিকর রকম নীরব।

অনেকেই আশা করেছিলেন যে আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিস্তার লাভ করা যথেচ্ছ ও অন্যায় আটক রাখার সংস্কৃতি তাদের পতনের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটবে। কিন্তু তার বদলে দেখা যাচ্ছে, নতুন সরকার মুখে সংস্কারের যতই বুলি আওড়াক, এই পুরোনো দমনমূলক চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় না কিংবা হয়তো পারছে না।

এ-ও সত্য হতে পারে যে, এই আটকগুলোর অনেকগুলোই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এফআইআরের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। এগুলো হয়তো সরাসরি সরকারের নয়, বরং রাজনৈতিক দল বা অন্য রাজনৈতিক চরিত্রের সহায়তায় দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু এসব অপব্যবহারে হস্তক্ষেপ করে সেগুলো সংশোধন করতে সরকারের ব্যর্থতা অগ্রহণযোগ্য।

… এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, বহু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুরুতর প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে এবং অনেকেই আছেন, যাঁদের গ্রেপ্তার ও আটক হওয়াটাই প্রাপ্য ছিল, যেমনটি অনেকের ক্ষেত্রে ঘটেছেও।

কিন্তু ওপরে উল্লিখিত ব্যক্তিরাসহ বর্তমানে যেসব ব্যক্তি কারাগারে রয়েছেন, তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা বা হত্যাপ্রচেষ্টার কোনো বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ নেই। এ মানুষগুলো বন্দী থাকার মূল কারণ হলো, তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের সমর্থক। তাঁরা গত ১৫ বছরের শাসনামলে প্রবলভাবে সরকারের অনুগত ছিলেন।

তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ অবশ্যই থাকতে পারে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে তাঁরা এমন এক সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যে সরকার বিরোধী দল দমন করেছে, নির্বাচনে জালিয়াতি করেছে, গুম করেছে, সংবাদমাধ্যমকে চুপ করিয়ে রেখেছে ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অন্যায়ভাবে মানুষকে আটক রেখেছে। রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনের কট্টর সমর্থক বা প্রচারক হওয়াটাই অপরাধ নয়।

… যেসব মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে একমাত্র ‘প্রমাণ’ হলো, তাঁরা গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগের প্রতি বাড়াবাড়ি রকম সমর্থন দেখিয়েছেন, অথবা জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করেছেন, সেসব ক্ষেত্রে সরকারের উচিত নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত সরকারি কৌঁসুলিদের জামিনের বিরোধিতা না করতে নির্দেশ দেওয়া।

… এসব অভিযোগসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অন্য কোনো অপরাধের সঙ্গেও জড়িত থাকতে পারেন, এমন সব বিষয় নিয়ে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যেতে পারবে না, এমন তো নয়। আর আদালত চাইলে জামিন দেওয়ার শর্ত হিসেবে বিদেশে যাওয়া নিষিদ্ধ করার মতো ব্যবস্থা নিতে পারেন।

… বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন এমন কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী দৃশ্যমান, যারা আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া ও মানবাধিকারকে উপেক্ষা করছে। বড় পরিহাসের বিষয় হলো, এরাই একসময় ঠিক এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে সরব ছিল। এই গোষ্ঠীগুলোর রয়েছে প্রবল রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রচারের ক্ষমতা। এবং তারা সম্ভবত কোনোভাবেই আটক আওয়ামী লীগপন্থীদের মুক্তির পক্ষে যাবে না, তাঁদের আটক অযৌক্তিক বা ভিত্তিহীন হলেও।

এই চাপের মুখে সরকারকে দৃঢ় থাকতে হবে। কিন্তু এই অবস্থানের ভার যদি শুধু আইনমন্ত্রীর কাঁধে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা সহজ হবে না; বরং এটি হতে হবে পুরো ইউনূস মন্ত্রিসভার একটি সম্মিলিত অবস্থান।

এখানে যাঁরা নিজেদের গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে দাবি করেন, তাঁদের সবারই স্পষ্ট ও প্রকাশ্যে এই বিষয়ে মুখ খুলতে হবে।তাঁদের বলতে হবে—বিচার প্রতিশোধ নয়, এবং সাংবিধানিক গণতন্ত্রে বিচারবহির্ভূতভাবে আটক রাখার কোনো স্থান নেই। …”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন