প্রতি ১°সে. তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে মানুষের দারিদ্র বাড়বে ১০% : গবেষণা

বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নানা গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক মডেলগুলো কীভাবে এই পরিবর্তনকে মূল্যায়ন করে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক মডেলগুলো পদ্ধতিগতভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবকে কম মূল্যায়ন করেছে। এই গবেষণার মতে, যদি বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তাহলে গড় ব্যক্তি আরো ৪০% গরিব হয়ে যাবে, যেটা পূর্বের কিছু অনুমানের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।

অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, যদি উষ্ণতা প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবুও বৈশ্বিক মাথাপিছু জিডিপি গড়ে ১৬% কমে যাবে। এটি পূর্ববর্তী অনুমানে যেখানে বলা হয়েছিল যে এই হ্রাস মাত্র ১.৪% হবে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান নীতিমালা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো অর্থনৈতিক মডেলগুলোর অপ্রতুলতা। ইন্টিগ্রেটেড অ্যাসেসমেন্ট মডেল (IAM) নামক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সরঞ্জামগুলো বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোর নীতি-নির্ধারণে সহায়তা করে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এসব মডেল চরম আবহাওয়া সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

Environmental Research Letters-এ প্রকাশিত নতুন গবেষণায় অর্থনৈতিক মডেলগুলোর একটি উন্নত সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর চরম আবহাওয়ার প্রভাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. টিমোথি নিল। গবেষণায় দেখা গেছে, ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে গড় ব্যক্তি ৪০% গরিব হয়ে যাবে, যা উন্নত মডেল ছাড়া ছিল মাত্র ১১%। একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো অর্থনৈতিক মডেলগুলো সাধারণত স্থানীয় আবহাওয়ার পরিবর্তনকে বিবেচনায় নেয়, কিন্তু চরম আবহাওয়ার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল কীভাবে প্রভাবিত হতে পারে তা বিবেচনা করে না।

নিল বলেন, ‘ ভবিষ্যতে চরম উষ্ণতর আবহাওয়ার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ধারাবাহিক বিঘ্ন ঘটবে।’ এই গবেষণার সহ-লেখক ও নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী অধ্যাপক অ্যান্ডি পিটম্যান বলেন, ‘চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোই সবচেয়ে বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে। এটি কেবল গড় তাপমাত্রার বিষয় নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক মডেলগুলোকে চরম আবহাওয়ার প্রভাব অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পুনর্গঠন করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে, যাতে দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলোর পূর্ণ মূল্যায়ন করতে পারে এবং এরপর যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে-নির্গমন কমানো।’

কিছু অর্থনীতিবিদ যুক্তি দেখিয়েছেন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে কানাডা, রাশিয়া এবং উত্তর ইউরোপের মতো ঠাণ্ডা অঞ্চলের জন্য কিছু ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। তবে গবেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত এবং একটি অঞ্চলের দুর্যোগ অন্য অঞ্চলেও প্রভাব ফেলতে পারে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ু নীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক জোটজো বলেন, IAM ভিত্তিক অর্থনৈতিক জলবায়ু মডেলগুলো ধরে নেয় যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি কোনো অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্বের অন্য কোনো অংশ থেকে উৎপাদন তাৎক্ষণিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক জটিল ও অস্থির একটি প্রক্রিয়া।

এই বছরের জানুয়ারিতে ইনস্টিটিউট অ্যান্ড ফ্যাকাল্টি অব অ্যাকচুয়ারিজ একটি প্রতিবেদনে জানায়, পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক ঝুঁকি মূল্যায়নগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবিক প্রভাব যেমন টিপিং পয়েন্ট, চরম আবহাওয়া, অভিবাসন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মানবস্বাস্থ্য বা ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এই মডেলগুলো থেকে পাওয়া তুলনামূলকভাবে স্বল্পপ্রভাবের ফলাফল জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে ধীরগতির এবং সীমিত প্রভাবসম্পন্ন বলে ভুলভাবে প্রচার করতে পারে, বরং এগুলো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা উচিত।’

এই গবেষণা থেকে বোঝা যায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি কতটা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, তা এখনো সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করা হয়নি। অর্থনৈতিক মডেলগুলোর সীমাবদ্ধতা দূর করে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। যদি সরকার ও নীতি-নির্ধারকরা দ্রুত পদক্ষেপ না নেন, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হতে পারে।তাই উন্নত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং টেকসই জলবায়ু নীতির মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন