ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলের বাসিন্দা জেনি বার্নস ২০০৮ সালের এক গ্রীষ্মের রাতে গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠলেন একটি গভীর গুঞ্জনের শব্দে। মনে হচ্ছিল যেন দূরে কোনো বিশাল ইঞ্জিন চলছে একটানা, ধীর কিন্তু প্রবলভাবে কানে ঢুকে যাচ্ছে। আশেপাশের কেউ কিছু শুনতে পাচ্ছিল না, তবু জেনি নিশ্চিত, এই শব্দটা বাস্তব। শব্দটি প্রতিদিন গভীর রাতে ফিরে আসতে থাকে। তার ঘুম নষ্ট হতে থাকে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ডাক্তাররা বলেন, ‘টিনিটাস’, কিন্তু জেনি জানেন, এটি তার মাথার ভেতর নয় বাইরেরই কিছু। এই শব্দই আজ বিশ্বজুড়ে ‘হাম সাউন্ড’ নামে পরিচিত একটি রহস্য যা এখনো সমাধান হয়নি।
‘হাম সাউন্ড’ কী?
‘হাম সাউন্ড’ হল একটি নিচু ফ্রিকোয়েন্সির (৩০৮০ হার্জ) গুঞ্জন, যা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি শুনতে পান। এটি সাধারণত রাতে শোনা যায় এবং অনেকের মতে এটি শরীরের ভেতরে কম্পনের মতো অনুভূত হয়। এই শব্দটি সাধারণত শিল্পাঞ্চলে নয় বরং প্রকৃতির কোল ঘেঁষে থাকা অঞ্চলে বেশি অনুভূত হয়, যেখানে পরিবেশ নিঃশব্দ।
১৯৯০-এর দশকে নিউ মেক্সিকোর মরুভূমি শহর টাওস-এ শত শত মানুষ অভিযোগ করতে থাকেন, তারা এক অদ্ভুত গুঞ্জন শুনছেন।সরকারিভাবে তদন্ত হয়, কিন্তু কোনও শব্দের উৎস শনাক্ত করা যায় না। অন্টারিও’র কানাডাতে ২০১১ সাল থেকে শুরু হয়ে এই হাম শব্দ এতই প্রবল হয় যে মানুষ ঘর ছেড়ে পালাতে থাকে। ২০১৩ সালের এক গবেষণায় সম্ভাব্য উৎস হিসেবে কাছাকাছি একটি স্টিল ফ্যাক্টরির কথা বলা হয়, কিন্তু প্রমাণ মেলেনি।
যুক্তরাজ্যে জেনির মতো অনেকেই এই শহরে ব্রিস্টল হাম নিয়ে একই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। ১৯৭০-এর দশক থেকে ব্রিস্টলে হাম শব্দের রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে এবং আজও অব্যাহত। নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে একদল মানুষ দাবি করেন, তারা প্রতি রাতে একটি ধ্বনি শুনতে পান যা কখনও ধীরে, কখনও তীব্র হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানী ও অডিও বিশেষজ্ঞরাও এই ধ্বনির উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত এর কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন : ২০১৫ সালে ফরাসি গবেষক ফ্যাব্রিস আরডুইন জানান, সমুদ্রের শক্তিশালী তরঙ্গ যখন মহাসাগরের তলদেশে আঘাত করে, তখন পৃথিবীর অভ্যন্তরে একধরনের কম্পন তৈরি হয়, এটি সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ‘হাম’ আকারে অনুভূত হয়।
কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় শিল্পস্থাপনা (স্টিল ফ্যাক্টরি, পাওয়ার প্ল্যান্ট) থেকে ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল কম্পন নির্গত হয়, যা হাম সৃষ্টি করতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই নিকটবর্তী কোন উৎস পাওয়া যায় না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, অনেকের ক্ষেত্রে ‘হাম’ আসলে শ্রবণ বিভ্রম বা টিনিটাসের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-সবাই কেন শুনছে না? আর কেনই বা নির্দিষ্ট এলাকায়ই বেশি শোনা যায়?
যেখানে বিজ্ঞান থেমে যায়, সেখানে আবার কন্সপিরেসি জন্ম নেয়! অনেকে মনে করেন, এই অদ্ভুত শব্দ হল ‘HAARP’-এর মতো গোপন সামরিক প্রকল্পের ফল। এটি মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ বা আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম এমন প্রযুক্তি হতে পারে।
কিছু UFO গবেষক মনে করেন, ‘হাম’ শব্দ সম্ভবত পৃথিবীতে ভিনগ্রহবাসীর উপস্থিতির প্রমাণ ও একধরনের যোগাযোগ সংকেত যা আমরা বোঝার মতো নই। আবার বিশ্বাস করা হয়, পৃথিবীর গভীরে হয়ত কিছু চালু আছে, মিলিটারি সাবমেরিন কমিউনিকেশন, বা গোপন মেশিন। যা মানুষকে অজান্তেই প্রভাবিত করছে। হাম শব্দ নিয়ে যারা ভোগেন, তাদের অনেকে দুশ্চিন্তা, ঘুমহীনতা এবং অবসাদে ভোগেন।এটি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে বড় প্রভাব ফেলে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি অজানা এবং অদৃশ্য উত্স থেকে আসা অনুভূতি মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ‘হাম সাউন্ড’ রহস্যময়, বিভ্রান্তিকর এবং বিভাজনমূলক। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৃতি-সব ব্যাখ্যা মিলেও এখনও এটি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি। এটি হয়তো কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা, অথবা কোনো অজানা বাহ্যিক প্রভাব, বা হতে পারে এমন কিছু, যার জন্য আমাদের জ্ঞান এখনো প্রস্তুত নয়।


