পৃথিবীর দীর্ঘতম রেলপথ কেন বন্ধ হয়ে আছে ?

বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে আন্তঃমহাদেশীয় যাতায়াতের ধারণা আজ আর কল্পনার বিষয় নয়। আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার উৎকর্ষতার ফলে এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পৌঁছানো এক দিনের বিষয়। তবে এর মধ্যেই কিছু ধারণা রয়েছে যেগুলোর বাস্তবতা আজও সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার মধ্যে। বিশ্বের দীর্ঘতম ট্রেনযাত্রা পর্তুগালের লাগোস শহর থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত তেমনই এক যাত্রা, যা ভূগোল, প্রযুক্তি ও রাজনীতির এক ক্রান্তিস্থলে দাঁড়িয়ে। প্রায় ১৮,৭৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা কার্যত অক্ষম।

এই রেলপথটি পর্তুগাল থেকে শুরু হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্য দিয়ে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। যাত্রাপথটি অতিক্রম করে অন্তত ১৩টি দেশ, পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড, বেলারুশ, রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর। এই ভ্রমণকে কেন্দ্র করে ইউরোপের আধুনিক হাই-স্পিড রেল এবং এশিয়ার দীর্ঘপথ অতিক্রমকারী আন্তঃদেশীয় ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের সমন্বয় দেখা যায়। প্রধান রুটের মধ্যে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে এবং চীন-লাওস রেলপথ অন্যতম। চীনের কুনমিং থেকে লাওস ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ এই রুটের একটি কার্যকর বাস্তবতা তৈরি করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যাত্রী এই যাত্রাটি একটি ধারাবাহিক ট্রেনে করতে পারবেন না, আলাদা আলাদা রুটে আলাদা ট্রেনে উঠে এই সংযোগে পৌঁছাতে হবে।

এই ট্রেনযাত্রাটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হলো সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়া ও বেলারুশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞা শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত করে, যার ফলে ইউরোপীয় নাগরিকদের জন্য রাশিয়া ও বেলারুশের প্রবেশ নিষিদ্ধ বা সীমিত। অথচ এই দুটি দেশ এই ট্রেন রুটের অবিচ্ছেদ্য অংশ। উল্লেখ্য রেলপথের অব্যাহত ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। একটি আন্তর্জাতিক ট্রেন যাত্রা কেবল প্রযুক্তিগত বা ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়, কূটনৈতিক সমঝোতার এক জটিল কাঠামো।

এই যাত্রাপথে অন্তত ১৩টি দেশের মধ্য দিয়ে যেতে হলে প্রয়োগযোগ্য প্রতিটি দেশের ভিসা গ্রহণ আবশ্যক। এক্ষেত্রে ইউরোপের শেঙ্গেন ভিসা কিছুটা সুবিধাজনক হলেও, রাশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দেশের জন্য আলাদা ভিসা প্রয়োজন, যার প্রত্যেকটি ভিন্ন নীতিমালার অধীন। এছাড়া প্রত্যেকটি দেশের অভ্যন্তরীণ রেলপথে আলাদা সময়সূচি, ট্রানজিট সময় ও টিকিট পদ্ধতি যাত্রাকে জটিল করে তোলে। একটি সম্পূর্ণ ট্রেন যাত্রা পরিকল্পনা করতে গেলে প্রতি দেশে একাধিকবার অবস্থান করতে হতে পারে, যার ফলে ট্রেন বদল, হোটেল বুকিং ও স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা পূর্ব-পরিকল্পিত না হলে যাত্রাটি কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এই যাত্রার আনুমানিক খরচ ১,২০০-১,৫০০ মার্কিন ডলার। তবে এতে যুক্ত হয় আলাদা টিকিট, ভিসা ফি, হোটেল খরচ, খাবার এবং অন্যান্য ব্যয়। তুলনামূলকভাবে এই ব্যয় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের চেয়ে বেশি এবং সময়ও দীর্ঘতর। ফলে ভ্রমণের আর্থিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। এই যাত্রা এখনো কেবল তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। ভবিষ্যতে যদি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং আন্তঃদেশীয় রেল সহযোগিতা ও অভিবাসন নীতি আরও নমনীয় হয়, তবে এই রুট একটি কার্যকর পর্যটন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।

বৈশ্বিক পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের চিন্তার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘপথ ট্রেনযাত্রা বিমানের বিকল্প হিসেবে আবারো গুরুত্ব পেতে পারে। ইউরোপে যেমন রেল পরিবহনকে বিমানের বদলে জনপ্রিয় করা হচ্ছে, তেমনি এশিয়াতেও পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পর্তুগাল থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত ট্রেনভিত্তিক এই দীর্ঘ ভ্রমণপথটি একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, তেমনি অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের প্রতীক। এটি একধরনের ‘সম্ভব অসম্ভবতা’-যেখানে মানুষের ইচ্ছা, কৌশল ও কূটনীতি একত্রে না মিললে ভ্রমণের বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা পায় না। এই যাত্রা কেবল রেলপথে একদেশ থেকে আরেক দেশে পৌঁছানোর ঘটনা নয় বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও যোগাযোগ নীতির একটি বৃহৎ বিন্যাস। ভবিষ্যতের এক সম্ভাব্য বাস্তবতা হিসেবেই তাই এই ট্রেনযাত্রা আজ আমাদের গবেষণার ও কল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে।





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন